
মিলন বৈদ্য শুভ, রাউজান (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতানপুর বণিকপাড়ায় সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী রাউজানে বাঘের মেলা। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই লোকজ আয়োজন স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বিবেচিত। গত ১৯ ও ২০ এপ্রিল (৫ ও ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) দুই দিনব্যাপী আয়োজিত এই মেলায় হাজারো দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গ্রামীণ ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণে এই মেলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মনপোদ্দার বাড়ির স্মৃতিবিজড়িত এই রাউজানে বাঘের মেলা আয়োজন করে মনপোদ্দার বাড়ি স্মৃতি সংসদ, মেলা উদযাপন পরিষদ এবং পূজা কমিটি। আয়োজকরা জানান, পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করানোই এই মেলার মূল লক্ষ্য। সময়ের পরিবর্তনে অনেক গ্রামীণ উৎসব হারিয়ে গেলেও এই মেলা এখনও তার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে, যা এলাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘বাঘের নৃত্য’, যা দেখতে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। রঙিন পোশাক ও মুখোশে সজ্জিত শিল্পীরা বাঘের আদলে নৃত্য পরিবেশন করেন, যা গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। এছাড়া বাঘের বিভিন্ন প্রদর্শনীও দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে। এই রাউজানে বাঘের মেলা ঘিরে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের মাঝে আনন্দ-উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়, যা একে একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত করেছে।

দুই দিনব্যাপী এই মেলায় ছিল নানা আয়োজন। মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকসংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার পাশাপাশি ঝুমকা তবলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা তবলায় বৃন্দবাদন ও তবলা লহরী পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। বিশিষ্ট তবলা প্রশিক্ষক প্রার্থপ্রতিম দাশের পরিচালনায় এই পরিবেশনা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। একই সঙ্গে আলোচনা সভায় বক্তারা লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন, যা রাউজানে বাঘের মেলা-কে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
মেলায় নাগরদোলা, কুটির শিল্পপণ্য এবং বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের স্টল দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেও এ ধরনের মেলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, এই মেলার মাধ্যমে তারা ভালো বিক্রির সুযোগ পান, যা তাদের জীবিকার জন্য সহায়ক।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন সমাজে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে। তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও রাউজানে বাঘের মেলা আরও বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করা হবে এবং দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ স্থান করে নেবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখতে এই মেলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি বলেও মত দেন তারা।
আরোও পড়ুন - দক্ষিণ রাউজানে বিশ্বশান্তি যজ্ঞে হাজারো ভক্তের সমাগম