
এনায়েত করিম রাজিব, বাগেরহাট প্রতিনিধি:
শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এগিয়ে চলার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের এক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ওহিদুল ইসলাম। ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে দেখিয়ে দিচ্ছে ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে থামাতে পারে না। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগলেও নিজের দৃঢ় মনোবল আর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে স্বপ্ন দেখে একদিন প্রকৌশলী হয়ে দেশের জন্য কাজ করার।
সরেজমিনে মোরেলগঞ্জ লতিফিয়া ফাজিল মাদ্রাসা পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, একাডেমিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে বসে বাম হাতে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে এই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। তার শরীরের অধিকাংশ অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে কাজ না করলেও বাম হাতই তার ভরসা। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতোই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সে তার খাতা সম্পন্ন করে জমা দিচ্ছে, যা উপস্থিত সবার কাছে বিস্ময় ও অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৮ বছর বয়সী ওহিদুল ইসলাম উপজেলার লেহাজ উদ্দিন দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। প্রতিদিন পরীক্ষা দিতে তাকে মায়ের সঙ্গে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। কঠিন এই যাত্রা সত্ত্বেও তার মুখে নেই কোনো ক্লান্তির ছাপ। বরং চোখে-মুখে দৃঢ় প্রত্যয়—জীবনের সকল বাধা পেরিয়ে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য সাহস।
পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব ও অধ্যক্ষ রুহুল আমিন জানান, এই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অতিরিক্ত সময় পাওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি গ্রহণ করেনি। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো আবেদন করেনি। তবুও সে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, যা তার আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতার পরিচায়ক।
ওহিদুলের মা তাসলিমা বেগম বলেন, তাদের একমাত্র সন্তান ওহিদুল জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। অনেক কষ্ট আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে বড় করে তুলেছেন। তিনি চান, তার সন্তানের স্বপ্ন পূরণ হোক এবং সে যেন সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে তার সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
পরীক্ষা শুরুর আগে ওহিদুল জানায়, জন্ম থেকেই বাম হাতের ওপর নির্ভর করে সে সব কাজ করে আসছে। সে বলে, আমি বাম হাত দিয়েই লিখি, পড়াশোনা করি এবং নিজের কাজ নিজেই করি। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি এবং এখন পর্যন্ত পরীক্ষাগুলো ভালো হয়েছে। আমি চাই আমার অধিকার অনুযায়ী সুযোগ পাই এবং ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী হতে চাই। এই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আরও যোগ করে, সে প্রমাণ করতে চায় প্রতিবন্ধিতা কখনোই সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না।
স্থানীয় শিক্ষকমণ্ডলী ও পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, ওহিদুলের এই সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সহায়তা করবে বলে তারা মনে করেন।
আরোও পড়ুন - কুড়িগ্রাম রাজারহাটে পঙ্গু রফিকুলের ঘর-দোকানের আশ্বাস | ইউএনও মানবিক উদ্যোগ