
আসলাম উদ্দিন, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় চাঞ্চল্যকর দাদী হত্যা ঘটনায় নিহত বৃদ্ধার নাতিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অনলাইনে জুয়া খেলা, মাদকাসক্তি এবং ঋণের চাপ থেকে মুক্তি পেতে তারা এই পরিকল্পনা করে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চুরি করতে গিয়ে ঘরের মালামাল নেওয়ার সময় বৃদ্ধা বাধা দিলে তাকে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয়রা দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দিনাজপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আনোয়ার হোসেন এসব তথ্য জানান। এ সময় জেলা গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাসহ ঘোড়াঘাট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ জানায়, আধুনিক প্রযুক্তি, মোবাইল ট্র্যাকিং ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দাদী হত্যা মামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন নিহত অলেদা বেওয়া (৭০)-এর নাতি ফজলে রাব্বি (২৯), মসফিকুর রহমান রাজ (৩৪) এবং নাজমুল হুদা শান্ত (২৬)। তাদের মধ্যে রাব্বি ও শান্ত ঘোড়াঘাট উপজেলার বাসিন্দা। অপরদিকে রাজ দিনাজপুর সদরের বাহাদুর বাজার এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, তিনজনের মধ্যে রাব্বিই পরিবারের সদস্য হওয়ায় বাড়ির ভেতরের অবস্থা, স্বর্ণালংকার কোথায় রাখা আছে এবং কখন বৃদ্ধা একা থাকেন এসব তথ্য আগে থেকেই জানত। সেই সুযোগ নিয়েই সংঘটিত হয় ভয়াবহ দাদী হত্যা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাব্বি দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে জুয়া খেলত এবং মাদকাসক্ত ছিল। এতে সে বড় অঙ্কের ঋণে জড়িয়ে পড়ে। ধারদেনা শোধ করতে দ্রুত টাকা জোগাড়ের জন্য সে দাদীর বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুটের পরিকল্পনা করে। পরে দুই সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নামে। পুলিশ বলছে, আর্থিক সংকট ও অপরাধপ্রবণ জীবনযাপনই তাকে এমন নৃশংস সিদ্ধান্তে ঠেলে দেয়।
ঘটনাটি ঘটে ২১ এপ্রিল দুপুরের পর ঘোড়াঘাট উপজেলার পালশা ইউনিয়নের পূর্ব পালশা গ্রামে। ওই দিন বৃদ্ধার ছোট মেয়ে কাজে বাইরে গেলে অলেদা বেওয়া বাড়িতে একা ছিলেন। এই সুযোগে অভিযুক্তরা ঘরে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা বৃদ্ধার হাত-পা স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলে। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর ঘর থেকে স্বর্ণালংকার, গয়না ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এমন দাদী হত্যা ঘটনা আগে এলাকায় কখনও ঘটেনি।
পুলিশ জানায়, ঘটনার পরপরই জেলা গোয়েন্দা শাখা, সাইবার ইউনিট ও ঘোড়াঘাট থানা যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোনের অবস্থান, লেনদেনের তথ্য এবং যোগাযোগ বিশ্লেষণ করে সোমবার (২৭ এপ্রিল) দিনভর অভিযান চালানো হয়। ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার গকুর নগর এলাকা থেকে ফজলে রাব্বি ও মসফিকুর রহমান রাজকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে ঘোড়াঘাট উপজেলার দেওগ্রাম এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে নাজমুল হুদা শান্তকে আটক করা হয়।
আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানায় পুলিশ। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতেও তারা সম্মতি জানিয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি স্বর্ণের হার, এক জোড়া বালা, এক জোড়া চেইন, এক জোড়া কানের দুল, এক জোড়া ঝুমকা এবং এক জোড়া রুপার নুপুর উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া এসব মালামাল নিহত পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। গ্রামের মানুষ বলছেন, পরিবারের আপনজনের হাতেই এমন হত্যাকাণ্ড সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা। প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক বিশ্বাস ভেঙে এ ধরনের অপরাধ বাড়লে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পরিবারে তরুণদের আচরণ, আসক্তি, অর্থনৈতিক চাপ এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে আগেভাগে সতর্ক থাকা জরুরি। ঘোড়াঘাটের এই দাদী হত্যা মামলা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি সমাজের জন্য বড় সতর্কবার্তাও বটে।
আরোও পড়ুন - ট্রাম্প হত্যাচেষ্টা অভিযোগে আদালতে অভিযুক্ত যুবক