
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১০ মে, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে। ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সহায়তাকারী দেশগুলোর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যেসব রাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সক্রিয় থাকবে, তাদের বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের সময় নানা ধরনের বাধা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নতুন এই বার্তার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে “হরমুজ উত্তেজনা”।
সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার পর অঞ্চলটির পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। ফলে “হরমুজ উত্তেজনা” দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
এরই মধ্যে কাতারের দোহা উপকূলের কাছে একটি মালবাহী জাহাজে রহস্যজনক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। যুক্তরাজ্যের সমুদ্রবিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও (UKMTO)-এর বরাতে জানা যায়, দোহা উপকূল থেকে প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকা জাহাজটিতে অজ্ঞাত কোনো প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। তবে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। কে বা কারা এই হামলা চালিয়েছে তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরে জাহাজে হামলা, ড্রোন হামলা এবং সামরিক উত্তেজনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “হরমুজ উত্তেজনা” আরও বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটগুলো ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সম্প্রতি মার্কিন যুদ্ধবিমানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ থেকে এখনও ধোঁয়া বের হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করেছে। তেহরান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির সময় তাদের জাহাজে পুনরায় হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হবে। এতে পুরো অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নয়, এই সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তেও। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজন শিশু রয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা হিজবুল্লাহর সদস্যদের লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে গোষ্ঠীটির বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংসের কথাও জানিয়েছে তারা।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় নতুন হামলা বা উসকানিমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। বিশেষ করে “হরমুজ উত্তেজনা” অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নিলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও ভয়াবহ সংঘাত শুরু হতে পারে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি ও সামরিক তৎপরতা বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
সূত্র: CNN
আরোও পড়ুন - হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা: ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে উত্তেজনা, ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি