
রাজশাহী প্রতিনিধি
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে বোর্ড কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি বোর্ডে ৬৬ জন অস্থায়ী কর্মচারীকে স্থায়ী করার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামনে এসেছে নিয়োগ বাণিজ্য অভিযোগ। বোর্ডের অভ্যন্তরে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, নিয়োগ, বদলি এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব খাটিয়ে আসছেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি স্থায়ী হওয়া ৬৬ জন কর্মচারীর তালিকা নিয়ে বোর্ডের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই তালিকায় নিজের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, স্থায়ী নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বোর্ডজুড়ে নতুন করে নিয়োগ বাণিজ্য অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি, তবে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে বলে জানা গেছে।
বোর্ড সূত্রে জানা যায়, মাহবুব মূলত একজন রেকর্ড সাপ্লাইয়ার হিসেবে চাকরিতে যোগ দিলেও বর্তমানে তার জীবনযাত্রা অনেক উচ্চবিত্ত ব্যক্তিকেও বিস্মিত করছে। রাজশাহীর অভিজাত এলাকায় বহুতল ভবন, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাধারণ সরকারি চাকরির আয়ে এত সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সহকর্মীরাও। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে তিনি আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতেন। ফলে শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া ইউনিয়নের প্রভাব ব্যবহার করে বোর্ডে নিজের বলয় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে মাহবুবের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার মতের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও প্রশাসনিক চাপে রাখা হতো। অনেক কর্মচারী অভিযোগ করেন, বদলি, ছুটি কিংবা দাপ্তরিক সুবিধা পেতেও ইউনিয়ন নেতার অনুমোদনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এ কারণে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক নিয়োগ বাণিজ্য অভিযোগ সামনে আসার পর সেই অসন্তোষ আরও প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও মাহবুবের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়েছিল। তবে রহস্যজনক কারণে সেই অভিযোগের তদন্ত কার্যকর অগ্রগতি পায়নি। এবার নতুন করে নিয়োগ স্থায়ী করার বিষয়টি সামনে আসায় পুরনো অভিযোগগুলোও আবার আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পড়বে। তাই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা বোর্ডে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেট নিয়োগ, পদোন্নতি এবং টেন্ডারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক নিয়োগ বাণিজ্য অভিযোগ কেবল একটি অংশমাত্র; প্রকৃত তদন্ত হলে আরও বড় অনিয়ম বেরিয়ে আসতে পারে। তারা দ্রুত দুদক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বোর্ড সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরোও পড়ুন - নজিরপুর সরকারি কলেজের ৪ রোভার স্কাউটের ১৫০ কিমি পায়ে হাঁটা যাত্রা শুরু