
মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. এম রেজাউল হকের মৃত্যুতে দেশের বিজ্ঞান অঙ্গন, রাজশাহী অঞ্চল এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ মে) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘ কর্মজীবনে মহাকাশ গবেষণা, প্রকৌশল শিক্ষা এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই কৃতি ব্যক্তিত্বের বিদায়ে শোকাহত তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। রেজাউল হকের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোক প্রকাশ করছেন অনেকেই।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভার কেল্লাবারুইপাড়া মহল্লার সন্তান ড. এম রেজাউল হক ছোটবেলা থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দেশীয় শিক্ষাজীবন শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। পরবর্তীতে কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের স্টেট ইউনিভার্সিটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে নাসার গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করে। নাসায় দীর্ঘ সময় কাজ করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন। তাঁর সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত স্বভাবের এবং গবেষণায় নিবেদিতপ্রাণ একজন বিজ্ঞানী।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ড. রেজাউল হকের বাবা ছিলেন মৃত ফহিম উদ্দিন বিশ্বাস এবং মা মৃত আনোয়ারা খাতুন। নয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁদের পরিবার দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক অঙ্গনেও সুপরিচিত। তাঁর বড় ভাই বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক। আরেক বড় ভাই প্রয়াত ড. এম এনামুল হক বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ছোট ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত জীবনে ড. রেজাউল হক অত্যন্ত বিনয়ী ও মানবিক মানুষ ছিলেন।
দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ড. রেজাউল হক ছিলেন অনুপ্রেরণার প্রতীক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি প্রায়ই বিভিন্ন পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন। বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে তাঁর উৎসাহ ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করলেও তিনি নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সহযোগিতা করতেন। অনেকেই মনে করছেন, রেজাউল হকের মৃত্যু দেশের বিজ্ঞান গবেষণা অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। পরিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে। এদিকে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনায় শুক্রবার জুমার নামাজের পর গোদাগাড়ীর কেল্লাবারুইপাড়া জামে মসজিদে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারাও সেখানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। রেজাউল হকের মৃত্যু সংবাদে রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ থেকে উঠে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় কাজ করা খুবই বিরল অর্জন। সেই জায়গায় ড. রেজাউল হক শুধু একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রতীক। তাঁর গবেষণা, শিক্ষা ও পেশাগত অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞানচর্চায় আরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, রেজাউল হকের মৃত্যু হলেও তাঁর কর্ম ও অবদান দেশের মানুষের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আরোও পড়ুন - রাজশাহী চেম্বার নির্বাচন: ইমাম মেহেদীর পরিবর্তনের অঙ্গীকার