
নুর নবী, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ
রাজনীতির মাঠে বছরের পর বছর সক্রিয় থেকেও আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার এক সময়ের পরিচিত ছাত্রনেতা আল আমিন। দলের জন্য দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও বর্তমানে জীবিকার তাগিদে রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত সড়কে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীদের বাস্তব জীবন। বিশেষ করে একজন ত্যাগী ছাত্রদল নেতা হিসেবে তার বর্তমান অবস্থা অনেকের মনে নাড়া দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছাত্রজীবন থেকেই আল আমিন সক্রিয়ভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন আন্দোলন, মিছিল, সভা-সমাবেশ, পোস্টারিং ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাকে সবসময় সামনের সারিতে দেখা যেত। রাজনৈতিক দুঃসময়ে হামলা-মামলা ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, কঠিন সময়েও আল আমিন দলের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি একজন সাহসী ও ত্যাগী ছাত্রদল নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বাস্তবতাও কঠিন হয়ে ওঠে। পরিবার চালানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো এবং কর্মসংস্থানের অভাবে একসময় ঢাকায় পাড়ি জমান আল আমিন। সেখানে কোনো চাকরি বা স্থায়ী আয়ের পথ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত রিকশা চালানোকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। পরিচিত অনেকেই বলছেন, রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকা একজন মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি কষ্টদায়ক হলেও আল আমিন কখনও অবৈধ পথ বেছে নেননি। নিজের শ্রম ও সততার ওপর ভর করেই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এই ত্যাগী ছাত্রদল নেতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুসময় এলেই সুবিধাবাদী ও নতুন মুখগুলো সামনে চলে আসে, অথচ দীর্ঘদিন মাঠে থাকা প্রকৃত ত্যাগী কর্মীরা ধীরে ধীরে আড়ালে পড়ে যান। আল আমিনের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিল, হামলা-মামলার শিকার হয়েছে, সংগঠনের জন্য সময় ও শ্রম দিয়েছে—বর্তমানে তাদের অনেকেই অবহেলিত। কেউ দিনমজুর, কেউ গার্মেন্টস কর্মী, আবার কেউ রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। অথচ রাজনৈতিক সফলতার পেছনে তাদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
এলাকার একাধিক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, “যখন মাঠে লোক পাওয়া যেত না, তখন আল আমিনদের মতো কর্মীরাই দলকে ধরে রেখেছিল। তারা কখনও ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতি করেনি। এখন সুসময় এলেও তাদের খোঁজ নেওয়ার মতো মানুষ খুব কম।” তারা আরও বলেন, “চেটে খাওয়ার চেয়ে খেটে খাওয়া ভালো—এই বিশ্বাস থেকেই আল আমিন কঠোর পরিশ্রম করে হালাল উপার্জন করছেন। একজন ত্যাগী ছাত্রদল নেতা হিসেবে তার এই সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মের জন্যও একটি শিক্ষা।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মূল শক্তি তৃণমূলের কর্মীরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর ভিড়ে প্রকৃত ত্যাগীরা অনেক সময় মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হন। এতে আদর্শিক রাজনীতির প্রতি তরুণদের আগ্রহও কমে যেতে পারে। তারা বলছেন, যারা দীর্ঘদিন দলীয় কর্মকাণ্ডে শ্রম ও সময় দিয়েছেন, তাদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আল আমিনের ছবি ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তার আত্মসম্মানবোধ ও পরিশ্রমী মানসিকতার প্রশংসা করছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, “রাজনীতি করে ক্ষমতার অপব্যবহার না করে, নিজের শ্রমে জীবন চালানোই প্রকৃত সততা।” আবার অনেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তৃণমূল কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করলে ভবিষ্যতে আদর্শিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
আরোও পড়ুন - কুড়িগ্রামে ধরলা ভাঙন আতঙ্ক, স্থায়ী বাঁধের দাবিতে মানববন্ধন