
মোঃ আলমগীর হোসাইন, রংপুর, বিভাগীয় ব্যুরো চিফঃ
কুড়িগ্রামে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দুইটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলার রায়গঞ্জ ইউনিয়নের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ, বারান্দা ও চলাচলের পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাদাপানি মাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। অনেকেই ভিজে যাচ্ছে বই-খাতা ও স্কুলব্যাগ। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
সরেজমিনে বিদ্যালয় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিদ্যালয় দুটির বিস্তীর্ণ মাঠ হাঁটুসমান পানিতে ডুবে রয়েছে। দূর থেকে পুরো এলাকাটি ছোট একটি জলাশয়ের মতো মনে হয়। বিদ্যালয় ভবনের চারপাশে থৈথৈ পানি জমে আছে, পানির মধ্যে হাঁস ভাসছে এবং কোথাও কোথাও ছোট মাছ চলাচল করতেও দেখা গেছে। বিদ্যালয়ের পাশের ঈদগাহ মাঠও পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণের পর আশপাশের ফসলি জমির পানি বিদ্যালয় এলাকায় এসে জমা হয়। কিন্তু পানি বের হওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদ্যালয়ের পাশের সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কালভার্ট কয়েক মাস আগে ভেঙে পড়ে। পরে নিরাপত্তার কারণে ওই পথে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে নির্মাণকাজের জন্য অতিরিক্ত বালু ফেলার কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে বিদ্যালয় ভবনের উন্নয়নকাজ ও আশপাশে বসতবাড়ি নির্মাণের সময় বালু ফেলার ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে পড়ে। এর ফলেই বর্তমানে কুড়িগ্রামে জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনা খাতুন রিতু, রুকাইয়া খাতুন ও মায়া খাতুন বলেন, বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে গিয়ে অনেক সময় কাদাপানিতে পিছলে পড়ে যেতে হয়। এতে ইউনিফর্ম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বই-খাতাও ভিজে যাচ্ছে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রমজান আলী জানায়, পানি জমে থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছে না। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ায় কয়েকদিন ধরে বিদ্যালয়ে আসাও বন্ধ রেখেছে।
একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয় এলাকায় মশা-মাছি, জোঁক ও বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি, চর্মরোগ, চুলকানি ও অ্যালার্জির মতো নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শিক্ষার পরিবেশ আরও খারাপ হবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ভাঙা কালভার্ট পুনর্নির্মাণ এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নতুন কালভার্ট নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।” স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয়সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠটিতে প্রতি বছর দুই ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আসন্ন ঈদুল আজহার নামাজ সেখানে আদায় করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যাটি থাকলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই দুর্ভোগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দ্রুত পরিস্থিতি পরিদর্শন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমবে এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
আরোও পড়ুন - সামান্য বৃষ্টিতেই জলমগ্ন নাগেশ্বরী শহর, বাড়ছে জনদুর্ভোগ