
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টারঃ
একসময় গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে মুখর করে তুলতেন তিনি। তার কণ্ঠের ডাক শুনলেই বাড়ির উঠোনে ভিড় জমাতেন নারীরা। রঙিন চুড়ি, ফিতা আর নারীদের সাজসজ্জার ছোটখাটো সামগ্রী বিক্রি করেই চলত সংসার। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় আজ সেই পরিচিত মুখটি হারিয়ে গেছে দারিদ্র্য আর অসহায়ত্বের অন্ধকারে। ঢাকার দোহার উপজেলার করিমগঞ্জ এলাকার প্রায় সত্তর বছর বয়সী অসহায় হাফেজা এখন নিজেই জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আসন্ন ঈদুল আজহার আনন্দঘন মুহূর্তেও তার ছোট্ট টিনের ঘরে নেই উৎসবের কোনো আমেজ, আছে শুধুই নীরব দীর্ঘশ্বাস।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া হাফেজার বর্তমান সম্বল একটি পুরোনো লাঠি। সেই লাঠির ওপর ভর করেই তিনি ধীরে ধীরে চলাফেরা করেন। একসময় যিনি মাইলের পর মাইল হেঁটে চুড়ি বিক্রি করতেন, আজ তার চোখে ঝাপসা দেখে, শরীরেও নেই আগের মতো শক্তি। দীর্ঘদিনের কষ্ট আর অপুষ্টিতে শরীর হয়ে গেছে কঙ্কালসার। এলাকাবাসীর ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিছু বিক্রি করার চেষ্টা করতেন, কিন্তু এখন আর শারীরিকভাবে তা সম্ভব হয় না। ফলে আয়-রোজগারের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে অসহায় হাফেজার।
হাফেজার সংসারের দুর্ভোগ আরও গভীর হয়েছে তার স্বামী মোবারক মিয়ার অসুস্থতায়। ৭৭ বছর বয়সী মোবারক মিয়া দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। চিকিৎসার খরচ তো দূরের কথা, প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই এখন তাদের পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ সন্তানের জননী হলেও সন্তানদের আর্থিক সংকটের কারণে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব পুরোপুরি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে একই ঘরে থাকলেও তার সামান্য আয়ে পুরো পরিবার কোনোমতে টিকে আছে। ফলে ঈদের সময়েও ঘরে নতুন কাপড় বা ভালো খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিশেষ ঈদ সহায়তা কিংবা প্রধানমন্ত্রীর উপহার থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন অসহায় হাফেজা। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ চার বছর আগে বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সাড়া পাননি তিনি। প্রতিবেশীদের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্রদের তালিকাভুক্ত করতে স্থানীয় পর্যায়ে অবহেলা ও অনিয়মের কারণেই এমন অসহায় মানুষ সরকারি সহায়তা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া জরুরি।
করিমগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই বৃদ্ধ দম্পতির জীবন এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর মতে, দ্রুত সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা না পেলে তাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে উঠবে। প্রতিবেশীরা আরও জানান, অনেক সময় না খেয়েই দিন পার করতে হয় এই দম্পতিকে। ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকায় অসুস্থতা দিন দিন বাড়ছে। অথচ একসময় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এই নারী আজ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করছেন।
চোখের জল মুছতে মুছতে হাফেজা বলেন, “যৌবনকালে কত মানুষের হাত রঙিন করছি বাবা, এখন নিজের জীবনটাই অন্ধকার। ঈদ আইতাছে শুনতাছি, কিন্তু আমাগো ঘরে কোনো আনন্দ নাই। বুড়ো স্বামীটা অসুস্থ হয়ে ঘরে পইড়া থাকে, ওষুধ কিনতে পারি না। আমরা কারো কাছে বিলাসিতা চাই না, শুধু দুইবেলা খাইয়া বাঁচতে চাই।”
আসন্ন কোরবানি ঈদের আনন্দ যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন করিমগঞ্জের এই ছোট্ট টিনের ঘরে চলছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। এলাকাবাসী দোহার উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন দ্রুত অসহায় হাফেজা ও তার শয্যাশায়ী স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
আরোও পড়ুন - রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমায় চুয়াডাঙ্গায় বন্দি মুক্তি | ঈদে কারামুক্ত আব্দুল মালেক