বন্ধ মাদ্রাসায় ধান-ভুট্টা শুকানো, শিক্ষা বঞ্চিত চরাঞ্চলের শিশুরা

মোঃ আলমগীর হোসাইন, রংপুর বিভাগীয় প্রধানঃ

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের টেকানী ঝগড়ার চর এলাকার একমাত্র স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে স্থানীয় শিশুদের শিক্ষাজীবন। একসময় যেখানে শিশুদের কোরআন শিক্ষা, প্রাথমিক পাঠদান ও খেলাধুলার প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর ছিল পুরো এলাকা, এখন সেখানে ধান ও ভুট্টা শুকানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই বন্ধ মাদ্রাসা চালুর বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের শিক্ষার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকানী ঝগড়ার চর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েক বছর নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চলেছে। চরাঞ্চলের শতাধিক শিশু এখানে ধর্মীয় ও প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করত। কিন্তু শিক্ষক সংকট, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ভবনের দেয়ালে ফাটল, ছাদের বিভিন্ন অংশ নষ্ট এবং সাইনবোর্ড বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় বন্ধ মাদ্রাসা এখন প্রায় পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষগুলোতে নেই কোনো বেঞ্চ বা শিক্ষাসামগ্রী। ভবনের সামনে ও কক্ষের ভেতরে স্থানীয় কৃষকরা ধান ও ভুট্টা শুকাচ্ছেন। কোথাও কোথাও গবাদিপশুও বেঁধে রাখা হয়েছে। শিশুদের হাসি-কোলাহলহীন নীরব পরিবেশ দেখে সহজেই বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এখানে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে কৃষিপণ্য শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার পরিবেশও নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

চরাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় তাদের সন্তানদের দূরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। ফলে এই বন্ধ মাদ্রাসা চালু না থাকায় অনেক শিশু প্রাথমিক ও ধর্মীয় শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, অনেক শিশু ইতোমধ্যে লেখাপড়া ছেড়ে কৃষিকাজ বা পারিবারিক কাজে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মেয়েশিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে, কারণ দূরের প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পরিবারগুলো নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যয়ের কারণে অনাগ্রহী।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, চরাঞ্চলে শিক্ষার হার এমনিতেই কম। সেখানে একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে থাকা পুরো এলাকার ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, ভবন সংস্কার এবং পাঠদান কার্যক্রম পুনরায় চালু না করা হলে শিক্ষাবঞ্চিত একটি প্রজন্ম তৈরি হবে। অনেকেই মনে করছেন, সরকারের শিক্ষা সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে এই এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা বন্ধ মাদ্রাসা এখন স্থানীয়দের হতাশা ও ক্ষোভের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এলাকাবাসী উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কার ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আবারও চালু করা হবে। স্থানীয়দের ভাষায়, শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই মাদ্রাসা পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। তারা চান, ধান-ভুট্টা শুকানোর স্থান নয়, বরং আবারও শিশুদের পাঠদানে মুখর হয়ে উঠুক টেকানী ঝগড়ার চর এলাকার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

আরোও পড়ুন – খাস জমি নামজারি বিতর্কে কুড়িগ্রাম সদর এসিল্যান্ডকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা

বন্ধ মাদ্রাসায় ধান-ভুট্টা শুকানো, শিক্ষা বঞ্চিত চরাঞ্চলের শিশুরা

মে ১২, ২০২৬

মোঃ আলমগীর হোসাইন, রংপুর বিভাগীয় প্রধানঃ

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের টেকানী ঝগড়ার চর এলাকার একমাত্র স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে স্থানীয় শিশুদের শিক্ষাজীবন। একসময় যেখানে শিশুদের কোরআন শিক্ষা, প্রাথমিক পাঠদান ও খেলাধুলার প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর ছিল পুরো এলাকা, এখন সেখানে ধান ও ভুট্টা শুকানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই বন্ধ মাদ্রাসা চালুর বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের শিক্ষার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকানী ঝগড়ার চর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েক বছর নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চলেছে। চরাঞ্চলের শতাধিক শিশু এখানে ধর্মীয় ও প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করত। কিন্তু শিক্ষক সংকট, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ভবনের দেয়ালে ফাটল, ছাদের বিভিন্ন অংশ নষ্ট এবং সাইনবোর্ড বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় বন্ধ মাদ্রাসা এখন প্রায় পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষগুলোতে নেই কোনো বেঞ্চ বা শিক্ষাসামগ্রী। ভবনের সামনে ও কক্ষের ভেতরে স্থানীয় কৃষকরা ধান ও ভুট্টা শুকাচ্ছেন। কোথাও কোথাও গবাদিপশুও বেঁধে রাখা হয়েছে। শিশুদের হাসি-কোলাহলহীন নীরব পরিবেশ দেখে সহজেই বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এখানে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে কৃষিপণ্য শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার পরিবেশও নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

চরাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় তাদের সন্তানদের দূরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। ফলে এই বন্ধ মাদ্রাসা চালু না থাকায় অনেক শিশু প্রাথমিক ও ধর্মীয় শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, অনেক শিশু ইতোমধ্যে লেখাপড়া ছেড়ে কৃষিকাজ বা পারিবারিক কাজে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মেয়েশিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে, কারণ দূরের প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পরিবারগুলো নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যয়ের কারণে অনাগ্রহী।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, চরাঞ্চলে শিক্ষার হার এমনিতেই কম। সেখানে একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে থাকা পুরো এলাকার ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, ভবন সংস্কার এবং পাঠদান কার্যক্রম পুনরায় চালু না করা হলে শিক্ষাবঞ্চিত একটি প্রজন্ম তৈরি হবে। অনেকেই মনে করছেন, সরকারের শিক্ষা সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে এই এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা বন্ধ মাদ্রাসা এখন স্থানীয়দের হতাশা ও ক্ষোভের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এলাকাবাসী উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কার ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আবারও চালু করা হবে। স্থানীয়দের ভাষায়, শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই মাদ্রাসা পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি। তারা চান, ধান-ভুট্টা শুকানোর স্থান নয়, বরং আবারও শিশুদের পাঠদানে মুখর হয়ে উঠুক টেকানী ঝগড়ার চর এলাকার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

আরোও পড়ুন – খাস জমি নামজারি বিতর্কে কুড়িগ্রাম সদর এসিল্যান্ডকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা