হামিদুর রহমান সবুজ, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মহান শিক্ষায় ভাস্বর এই উৎসবকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো নারায়ণগঞ্জেও জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি এবার নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাটের মাইক দূষণ। ক্রেতা আকর্ষণ, ইজারাদারদের প্রচারণা এবং বিক্রেতাদের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে মাইক বাজানোয় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের পাশেই গড়ে ওঠা এসব হাটে অবিরাম শব্দদূষণ এখন জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক শান্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এলাকার বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ হাটেই সারাদিন উচ্চস্বরে মাইকিং করা হচ্ছে। কোথাও পশুর দাম ঘোষণা, কোথাও গান-বাজনা, আবার কোথাও ব্যবসায়িক প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে গভীর রাত পর্যন্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে, অনেকেই রাতে ঘুমাতে পারছেন না। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ঈদের হাট থাকবে—এটি স্বাভাবিক বিষয়, কিন্তু হাটের মাইক দূষণ যেভাবে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম শান্তি, সহনশীলতা ও মানবকল্যাণের ধর্ম। অন্যকে কষ্ট দেওয়া বা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন সৃষ্টি করাকে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে”। আলেমরা বলছেন, কোরবানির হাটে প্রয়োজনীয় ঘোষণা সীমিত পরিসরে দেওয়া যেতে পারে, তবে উচ্চশব্দে সারাদিন মাইক বাজিয়ে মানুষকে বিরক্ত করা ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী। এমনকি অতিরিক্ত শব্দে পশুরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, যা ইসলামের প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘসময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়। উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ, মাথাব্যথা এবং শ্রবণশক্তি হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। নবজাতক, হৃদরোগী ও বয়স্কদের জন্য এ ধরনের শব্দদূষণ আরও ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় কয়েকটি ক্লিনিকের চিকিৎসকরাও জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে হাটের আশপাশের এলাকায় শব্দজনিত সমস্যায় ভোগা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ম না মানলে হাটের মাইক দূষণ ভবিষ্যতে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও শব্দদূষণ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেলের বেশি হওয়া আইনত নিষিদ্ধ। এছাড়া রাত ১০টার পর উন্মুক্ত স্থানে মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহারে কড়াকড়ি বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ বাস্তবে নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ পশুর হাটে এই আইন মানার কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় ইজারাদাররা নিয়ম ভঙ্গ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন।
সামাজিক সচেতনতার অভাবও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, উচ্চশব্দে প্রচারণা চালালে ক্রেতা বেশি আকৃষ্ট হয়। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, উৎসবের নামে মানুষের শান্তি নষ্ট করা কোনো সভ্য আচরণ নয়। কোরবানির মূল শিক্ষা হচ্ছে ত্যাগ ও সংযম। সেখানে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে ব্যবসায়িক প্রচারণা চালানো নৈতিকতার পরিপন্থী। তাই সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, নাসিক কর্তৃপক্ষ যেন হাটের ইজারা দেওয়ার সময়ই কঠোর শর্ত আরোপ করে। জরুরি ঘোষণা ছাড়া কোনো ধরনের উচ্চশব্দের মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতন মহল মনে করছে, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে হাটের মাইক দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
কোরবানির পশুর হাট দেশের অর্থনীতি ও ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সেই আয়োজন যেন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। পবিত্র ঈদুল আযহার প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে উঠবে, যখন ধর্মীয় আবহ, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক শান্তি—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে।
আরোও পড়ুন – নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী আসছেন শুক্রবার নারায়ণগঞ্জে, জুমার নামাজ মাসদাইর মসজিদে
কোরবানির হাটে মাইক দূষণ: নারায়ণগঞ্জে জনস্বাস্থ্য ও ইসলামি মূল্যবোধ হুমকিতে
হামিদুর রহমান সবুজ, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মহান শিক্ষায় ভাস্বর এই উৎসবকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো নারায়ণগঞ্জেও জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি এবার নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাটের মাইক দূষণ। ক্রেতা আকর্ষণ, ইজারাদারদের প্রচারণা এবং বিক্রেতাদের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে মাইক বাজানোয় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের পাশেই গড়ে ওঠা এসব হাটে অবিরাম শব্দদূষণ এখন জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক শান্তির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এলাকার বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ হাটেই সারাদিন উচ্চস্বরে মাইকিং করা হচ্ছে। কোথাও পশুর দাম ঘোষণা, কোথাও গান-বাজনা, আবার কোথাও ব্যবসায়িক প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে গভীর রাত পর্যন্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে, অনেকেই রাতে ঘুমাতে পারছেন না। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ঈদের হাট থাকবে—এটি স্বাভাবিক বিষয়, কিন্তু হাটের মাইক দূষণ যেভাবে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম শান্তি, সহনশীলতা ও মানবকল্যাণের ধর্ম। অন্যকে কষ্ট দেওয়া বা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন সৃষ্টি করাকে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে”। আলেমরা বলছেন, কোরবানির হাটে প্রয়োজনীয় ঘোষণা সীমিত পরিসরে দেওয়া যেতে পারে, তবে উচ্চশব্দে সারাদিন মাইক বাজিয়ে মানুষকে বিরক্ত করা ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী। এমনকি অতিরিক্ত শব্দে পশুরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, যা ইসলামের প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘসময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়। উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ, মাথাব্যথা এবং শ্রবণশক্তি হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। নবজাতক, হৃদরোগী ও বয়স্কদের জন্য এ ধরনের শব্দদূষণ আরও ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় কয়েকটি ক্লিনিকের চিকিৎসকরাও জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে হাটের আশপাশের এলাকায় শব্দজনিত সমস্যায় ভোগা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ম না মানলে হাটের মাইক দূষণ ভবিষ্যতে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও শব্দদূষণ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেলের বেশি হওয়া আইনত নিষিদ্ধ। এছাড়া রাত ১০টার পর উন্মুক্ত স্থানে মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহারে কড়াকড়ি বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ বাস্তবে নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ পশুর হাটে এই আইন মানার কোনো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় ইজারাদাররা নিয়ম ভঙ্গ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন।
সামাজিক সচেতনতার অভাবও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, উচ্চশব্দে প্রচারণা চালালে ক্রেতা বেশি আকৃষ্ট হয়। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, উৎসবের নামে মানুষের শান্তি নষ্ট করা কোনো সভ্য আচরণ নয়। কোরবানির মূল শিক্ষা হচ্ছে ত্যাগ ও সংযম। সেখানে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে ব্যবসায়িক প্রচারণা চালানো নৈতিকতার পরিপন্থী। তাই সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, নাসিক কর্তৃপক্ষ যেন হাটের ইজারা দেওয়ার সময়ই কঠোর শর্ত আরোপ করে। জরুরি ঘোষণা ছাড়া কোনো ধরনের উচ্চশব্দের মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতন মহল মনে করছে, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে হাটের মাইক দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
কোরবানির পশুর হাট দেশের অর্থনীতি ও ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সেই আয়োজন যেন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। পবিত্র ঈদুল আযহার প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে উঠবে, যখন ধর্মীয় আবহ, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক শান্তি—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে।
আরোও পড়ুন – নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী আসছেন শুক্রবার নারায়ণগঞ্জে, জুমার নামাজ মাসদাইর মসজিদে