
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার
টকটকে সোনালি রং আর মৌ মৌ গন্ধে চারপাশ জানান দিচ্ছে এখন বৈশাখের আগমন। কাঠফাটা রোদে ক্লান্ত মানুষ যখন একটু স্বস্তি খোঁজে, তখন এক ফালি রসালো বাঙ্গী যেন অমৃতের মতো তৃপ্তি এনে দেয়। আর যদি সেই ফল হয় ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভাঙা ভিটার বাঙ্গী, তাহলে তো কথাই নেই। এই বাঙ্গী কেবল একটি ফল নয়, বরং এটি এখন একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষি ঐতিহ্য ও স্বাদের অনন্য পরিচয় বহন করে চলেছে।
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কৈলাইল ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম হলো ভাঙা ভিটা। এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের বেলে-দোআঁশ মাটি বাঙ্গী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় কৃষকরা প্রথাগত পদ্ধতিতে এবং জৈব সার ব্যবহার করে ভাঙা ভিটার বাঙ্গী চাষ করে আসছেন। কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করায় এই বাঙ্গীর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে। চৈত্র ও বৈশাখ মাসে মাঠজুড়ে যখন বাঙ্গী পাকতে শুরু করে, তখন এর সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণত অন্যান্য অঞ্চলের বাঙ্গীর তুলনায় এই এলাকার বাঙ্গী স্বাদে অনেক বেশি মিষ্টি ও রসালো। পরিপক্ক হলে বাঙ্গীগুলো বড় আকার ধারণ করে এবং উজ্জ্বল সোনালি বা গাঢ় হলুদাভ রঙ ধারণ করে। ভাঙা ভিটার বাঙ্গী-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর তীব্র সুগন্ধ, যা দূর থেকেই অনুভব করা যায়। প্রতিদিন ভোর থেকেই স্থানীয় ঘাটগুলোতে বসে বাঙ্গীর জমজমাট হাট, যেখানে কৃষকরা সরাসরি খেত থেকে তুলে বাঙ্গী বিক্রি করেন।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখা যায় বিকেলের দিকে। স্থানীয় একটি ব্রিজের ওপর প্রতিদিন বসে এক প্রাণবন্ত ‘বাঙ্গীর মেলা’, যেখানে মানুষের ঢল নামে। ক্রেতারা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন শুধুমাত্র ভাঙা ভিটার বাঙ্গী সংগ্রহের জন্য। এই মেলা শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়, বরং এটি এক ধরনের সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে গ্রামীণ জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য ফুটে ওঠে।
নবাবগঞ্জের সীমানা ছাড়িয়ে এই বাঙ্গীর সুনাম এখন রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বান্দুরা, জয়পাড়া ও মাঝিরকান্দা বাজার হয়ে ট্রাক ও ট্রলারযোগে এই বাঙ্গী পৌঁছে যায় রাজধানীর বিভিন্ন বড় আড়তে। কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী ও বাদামতলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে ভাঙা ভিটার বাঙ্গী নামে এটি বিশেষভাবে পরিচিতি পেয়েছে এবং ক্রেতাদের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হচ্ছে।
স্থানীয় চাষিদের মতে, প্রতিবছর ফলন ভালো হলেও পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও গুণগত মান ও ঐতিহ্যের কারণে এই বাঙ্গীর চাহিদা কখনো কমে না। কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা পেলে ভাঙা ভিটার বাঙ্গী আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে।
ভাঙা ভিটার এই সোনালি বাঙ্গী শুধু কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে না, বরং দোহার-নবাবগঞ্জ অঞ্চলের গৌরবকেও ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশজুড়ে। এটি এখন গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরোও পড়ুন - মোরেলগঞ্জে সূর্যমুখী চাষে বাম্পার ফলন, কৃষকের মুখে হাসি