
মোঃ সাইফুর রহমান,স্টাফ রিপোর্টারঃ
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় অসহায় এক বৃদ্ধ দম্পতির জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করা পঙ্গু রফিকুল ইসলাম এবং তার প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন স্ত্রী আমেনা খাতুনের কুঁড়েঘরে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাদের করুণ চিত্র দেখেই সরেজমিনে ছুটে যান তিনি। সেখানে গিয়ে শুধু তাৎক্ষণিক খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা নয়, বরং রফিকুলের ঘর নির্মাণ এবং জীবিকার জন্য দোকান সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের বাছড়া বালাটারী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ইউএনও’র আগমনে গ্রামজুড়ে এক অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত একটি পরিবারের পাশে প্রশাসনের এমন সরাসরি উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিশেষ করে, রফিকুলের ঘর নির্মাণের ঘোষণাকে ঘিরে আশাবাদী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকাবাসী।
৭৫ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম শারীরিকভাবে পঙ্গু। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার চলাফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে তার স্ত্রী আমেনা খাতুনও দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন। ফলে তাদের জীবিকা নির্বাহের কোনো উপায় ছিল না। বছরের পর বছর ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভর করে চলেছে তাদের সংসার। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন কাটানোই ছিল তাদের নিয়তি। এমন করুণ বাস্তবতায় মানবিক সহায়তার আলো যেন অনেক দূরের স্বপ্ন ছিল।
তবে গত ১৭ এপ্রিল স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে তাদের জীবনসংগ্রামের হৃদয়বিদারক চিত্র প্রকাশিত হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হতে শুরু করে। খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নজরে আসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল ইমরানের। তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শনের উদ্যোগ নেন এবং রফিকুলের ঘর নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।
পরিদর্শনকালে ইউএনও সঙ্গে নিয়ে যান খাদ্যসামগ্রী, চাল-ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য এবং কিছু নগদ অর্থ। এসব সহায়তা হাতে পেয়ে রফিকুল দম্পতির চোখে মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির ছাপ। তবে ইউএনও এখানেই থেমে থাকেননি। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ঘোষণা দেন, সরকারের “ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প”-এর আওতায় খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে রফিকুলের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি তার পুরনো টং দোকানটি সংস্কার করে পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, শুধু দোকান সংস্কার নয়, দোকান চালু রাখার জন্য প্রাথমিক পুঁজি এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীও সরবরাহ করা হবে, যাতে রফিকুল আর ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে যেতে না হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তাকে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্থানীয়রা অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং এটিকে একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান, স্থানীয় সামাজিক সংগঠন “পথের আলো”-এর সভাপতি, উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি, সমাজসেবক মোঃ আনিছুর রহমান লিটন, ব্যবসায়ী রায়হানুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। ফলে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের অন্যান্য স্তর থেকেও সহমর্মিতার একটি চিত্র ফুটে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খবরটি প্রকাশের পর থেকেই গ্রামের অনেকেই রফিকুলের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন। কেউ খাদ্য দিয়েছেন, কেউ অর্থ সহায়তা করেছেন। তবে প্রশাসনের সরাসরি উদ্যোগ তাদের মনে আলাদা আস্থা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, রফিকুলের ঘর নির্মাণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় তারা এটিকে একটি স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন।
রফিকুল ইসলাম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আমি কোনোদিন ভাবিনি কেউ আমার জন্য ঘর বানিয়ে দেবে। এতদিন শুধু কষ্ট করেছি। এখন যদি দোকানটা ঠিক হয়, তাহলে আর ভিক্ষা করতে হবে না। আল্লাহ ইউএনও স্যারকে ভালো রাখুক। তার এই কথাগুলো উপস্থিত সবার চোখে জল এনে দেয় এবং মানবিকতার গভীরতা আরও স্পষ্ট করে তোলে।
ইউএনও মো. আল ইমরান বলেন, একটি সংবাদ শুধু তথ্য দেয় না, এটি সমাজকে নাড়া দেয়। আমরা চাই, কেউ যেন অনাহারে না থাকে, কেউ যেন অবহেলায় না পড়ে থাকে। এই পরিবারের জন্য রফিকুলের ঘর নির্মাণ এবং দোকান চালুর মাধ্যমে আমরা তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতে চাই। এটি শুধু একটি সহায়তা নয়, বরং তাদের নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ।
তিনি আরও জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের অসহায় মানুষের তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে সহায়তা দেওয়া হবে। যাতে করে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলো ধীরে ধীরে মূলধারায় ফিরে আসতে পারে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজসেবীদের সহযোগিতা নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্টের পর রফিকুলের জীবনে এই পরিবর্তন যেন নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তার কুঁড়েঘরে এখন আর হতাশা নয়, বরং আশার আলো জ্বলছে। গ্রামের মানুষজনও এই পরিবর্তনে আনন্দিত। তারা মনে করছেন, এই ধরনের উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।
স্থানীয় মুরুব্বিরা বলেন, আমরা অনেক ইউএনও দেখেছি, কিন্তু এমন মানবিক আচরণ খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু দায়িত্ব পালন করেননি, একজন মানুষের মতো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই উদ্যোগ আমাদের সমাজকে আরও মানবিক করে তুলবে।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে এই ঘটনা প্রমাণ করে—সঠিক সময়ে একটি সংবাদ, একটি মানবিক সিদ্ধান্ত এবং কিছু সদিচ্ছা মিলেই বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের পুরো জীবন। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি স্বপ্ন, রফিকুলের ঘর।
আরোও পড়ুন - রাজারহাটে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু ফাহিম বাঁচতে চায়, চিকিৎসার জন্য সহায়তার আবেদন