
বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তাদের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে। সর্বশেষ ঘটনায় “চিতলমারীতে দখল-লুটপাট” এর পাশাপাশি নারী নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। বৃহস্পতিবার আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা তাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে কালাম শিকদার, আউলিয়া শেখ ও মোহাম্মাদ শেখের নেতৃত্বে ১২-১৩ জনের একটি সশস্ত্র দল সিরামপুর মৌজার তাদের বসতভিটা ও মৎস্য ঘেরে হামলা চালায়। হামলাকারীরা লোহার রড, কুড়াল, রামদা ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ছিল বলে তারা জানান। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই নতুন করে এলাকায় “চিতলমারীতে দখল-লুটপাট” পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে বলে অভিযোগ উঠে।
হামলার সময় দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয়। আতঙ্কে পরিবারের নারী ও শিশুসহ সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এসময় এক নারীকে ঘরের ভেতরে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযুক্ত মোহাম্মাদ শেখ ওই নারীকে মারধর করে এবং তার পরিহিত কাপড় ছিঁড়ে ফেলে অপমানজনক আচরণ করে। পরে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে এনে আরও নির্যাতন করা হয়, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ বলে তারা উল্লেখ করেন।
এছাড়া হামলাকারীরা একটি স্বর্ণের চেইন ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘরের ভেতরে থাকা আইপিএস, ব্যাটারি, আসবাবপত্রসহ প্রায় ৭ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়। এতে পরিবারগুলো চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় “চিতলমারীতে দখল-লুটপাট” এর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
হামলার এক পর্যায়ে দুর্বৃত্তরা বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি টিনের ঘর ও তিনটি গোলপাতার ঘরে ডিজেল ঢেলে আগুন লাগানো হয়, ফলে মুহূর্তের মধ্যে ঘরগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনে শুধু ঘরবাড়িই নয়, ভেতরে থাকা প্রয়োজনীয় নথিপত্র, পোশাক ও খাদ্যসামগ্রীও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এতে ভুক্তভোগীরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন এবং বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, তারা দীর্ঘ ১২-১৩ বছর ধরে প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে মৎস্য ঘের পরিচালনা করে আসছিলেন। এই ঘেরই ছিল তাদের একমাত্র জীবিকার উৎস। কিন্তু হামলাকারীরা শুধু ঘরবাড়ি নয়, তাদের ঘেরেও লুটপাট চালায়। একই দিন রাতে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ ও একটি ডিজেল চালিত মেশিন লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ঘেরের জাল, টিউবওয়েল ও বিভিন্ন গাছপালাও তুলে নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, এই পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে তাদের এলাকা থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে। তারা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং যেকোনো সময় পুনরায় হামলার আশঙ্কা করছেন। “চিতলমারীতে দখল-লুটপাট” পরিস্থিতির কারণে তারা এলাকা ছেড়ে পালানোর হুমকির মধ্যে রয়েছেন বলেও জানান।
এ ঘটনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবর রহমান, মরিয়ম বেগম, হাবিবুর হালদার ও বিশ্বাস আব্দুল হালিমসহ স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। তারা সবাই এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসী আশা করছেন, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরোও পড়ুন - বাগেরহাটে গুলিতে যুবক নিহত | চিতলমারীতে চাঞ্চল্য