
মিলন বৈদ্য শুভ, রাউজান (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া (উভলং) এলাকায় ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী জ্বালা কুমারী মাতৃমন্দিরের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাউজান মাতৃমন্দির উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত এই মহোৎসবে ভক্তদের ব্যাপক উপস্থিতি পুরো এলাকাকে উৎসবমুখর করে তোলে। ২৩ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মহানামযজ্ঞ এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে।
উৎসবের প্রথম দিন সকালে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়। পরে শ্রীমদ্ভগবদগীতা পাঠ, ভক্তিমূলক সংগীত পরিবেশন, নৃত্যানুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী চলা এই আয়োজন ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। স্থানীয়দের মতে, প্রতিবছর এই আয়োজন হলেও এবারের রাউজান মাতৃমন্দির উৎসব ছিল আরও বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল।
এদিন বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে কীর্তন পরিবেশন করেন বেতার শিল্পী শ্রী সুধমা দাশ সুজন, যার সুরে ভক্তিমূলক পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করেন শ্রীশ্রী রাধামুকুন্দ সেবাকুঞ্জের অধ্যক্ষ শ্রী ঠাকুর নরোত্তম দাস বাবাজী মহারাজ। ধর্মীয় অনুষঙ্গের পাশাপাশি গঙ্গা আহ্বান ও শুভ অধিবাস কীর্তন ভক্তদের মাঝে গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির জন্ম দেয়।
এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল অষ্টপ্রহরব্যাপী শ্রীশ্রী তারকব্রহ্ম মহানামযজ্ঞ। ভক্তরা নিরবচ্ছিন্নভাবে নামসংকীর্তনে অংশ নেন, যা পুরো এলাকা জুড়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। মন্দির প্রাঙ্গণে শ্রীশ্রী জ্বালা কুমারী মায়ের পূজা, রাজভোগ নিবেদন, ভোগরতি কীর্তন এবং অন্নপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা ধর্মীয় প্রশান্তি অনুভব করেন।
মহোৎসব পরিচালনা পরিষদের সভাপতি বিন্দু রাম দাশের সভাপতিত্বে এবং সহ-সভাপতি শিক্ষক কিরণ দাশের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ রাউজান কেন্দ্রীয় মা মগধেশ্বরী ও গঙ্গা মন্দির পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লিটন মহাজন (লিটু)। এছাড়াও দোলন কৃষ্ণ ঘোষ, অঞ্জন বিশ্বাস, শাহাজাহান, শুভাশীষ চক্রবর্তী, শিবু ভট্টাচার্য ও সুজন দে প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
গীতা পাঠ প্রতিযোগিতা ছিল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। এতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন বিটু কান্তি দে, অর্পন মহাজন (রিপু) এবং প্রিন্স চৌধুরী (শুভ)। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী তরুণদের উৎসাহ ও পারদর্শিতা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। আয়োজকরা জানান, ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটাতে এই ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় দিন গভীর রাতে শ্রী নিত্যানন্দ সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় মনোমুগ্ধকর ‘কৃষ্ণলীলা’ মঞ্চস্থ হয়। নাট্যরূপে উপস্থাপিত এই লীলা ভক্তদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং দর্শকরা দীর্ঘ সময় ধরে তা উপভোগ করেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এই রাউজান মাতৃমন্দির উৎসব-এর প্রাণবন্ততা আরও বাড়িয়ে তোলে।
তৃতীয় ও শেষ দিন ঊষালগ্নে মহানামযজ্ঞের পূর্ণাহুতি প্রদান করা হয়। পরে মাঙ্গলিক নগর পরিক্রমার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। এই শোভাযাত্রায় শত শত ভক্ত অংশগ্রহণ করেন এবং ধর্মীয় সংগীত ও শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আয়োজকরা জানান, এই ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করে।

উৎসবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত চারটি খ্যাতনামা কীর্তনীয়া দল অংশগ্রহণ করে। শ্রীশ্রী আদিত্য নারায়ণ সম্প্রদায়, শ্রীশ্রী প্রভু প্রাণকৃষ্ণ সম্প্রদায়, শ্রীশ্রী নিত্যানন্দ সম্প্রদায় এবং শ্রীশ্রী রামকানাই সম্প্রদায় তাদের পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে। প্রতিটি দলের পরিবেশনায় ছিল ভক্তিমূলক আবেগ ও সুরের মাধুর্য।
তিন দিনব্যাপী এই বিশাল আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মেলায় অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল এবং বিভিন্ন সামগ্রীর বিক্রি বেড়ে যায়। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। আয়োজকদের মতে, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে রাউজান মাতৃমন্দির উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরোও পড়ুন - রাউজানে বাঘের মেলা: ২০০ বছরের ঐতিহ্যে লোকজ উৎসবে জনস্রোত