
বিশেষ প্রতিনিধি ( কুড়িগ্রাম )
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বজরা হাটে পুরোনো সেড অপসারণকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, সরকারি সম্পদ ক্ষতি এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর দাবি, বজরা হাট নিলাম প্রক্রিয়ার আড়ালে একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি জমির মাটি কেটে বিক্রি করেছে। এতে শুধু সরকারি সম্পদের ক্ষতিই হয়নি, বর্ষা মৌসুমে হাট এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে এবং দ্রুত তদন্তের দাবি উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে সরেজমিনে বজরা হাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো সেড অপসারণের সময় শুধু কাঠামোর মালামাল সরানো হয়নি, পাশাপাশি সরকারি জায়গার মাটিও গভীরভাবে খনন করে ট্রাকযোগে বাইরে নেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, রাতের আঁধারে একাধিক ট্রাক দিয়ে মাটি সরানোর ঘটনা ঘটেছে। এতে হাটের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বজরা হাট নিলাম ঘিরে শুরু থেকেই নানা ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা ছিল।
স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কালপানি মৌজার দাগ নং-১৪৫১ এর ৭০ শতাংশ এবং বজরা মৌজার দাগ নং-৩০০১ এর ৮ শতাংশ, ৩০০২ এর ১১ শতাংশ ও ৩০৪৫ এর ২০ শতাংশসহ মোট ১০৯ শতাংশ জমির মালিক বাংলাদেশ সরকার। অভিযোগ রয়েছে, নিলামের সুযোগ নিয়ে এসব সরকারি জমির মাটি কেটে বিক্রি করা হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের নজরদারির অভাবেই এমন ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অনিয়ম ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
এদিকে হাট সংস্কারের নামে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয় যুবদল নেতা মুকুল, বাবলা এবং বজরা ইউনিয়নের সহকারী তহসিলদার রুহুল আমিনের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামও ব্যবহার করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, দোকান সংস্কার ও হাট উন্নয়নের কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হয়েছে। প্রশাসনের নাম জড়িয়ে থাকায় অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে বজরা হাট নিলাম সংশ্লিষ্ট মহলেও আলোচনা চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী তহসিলদার রুহুল আমিন বলেন, মুকুল ও বাবলা প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে টাকা তুলছে এমন অভিযোগ মানুষের মুখে শুনেছেন। তবে তিনি সরাসরি কোনো ঘটনা দেখেননি। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় প্রশাসনের নয়। অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সরকারি হাটের যেকোনো সংস্কার কাজ নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কেউ যদি প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ আদায় বা সরকারি সম্পদ ক্ষতির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উলিপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদী হাসান বলেন, তার নাম ব্যবহার করে কেউ টাকা উত্তোলন করে থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি জমির মাটি কাটার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী বলছেন, বজরা হাট নিলাম ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। অন্যথায় সরকারি সম্পদ রক্ষা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে।
ঘটনাটি নিয়ে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা অবিলম্বে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনরুদ্ধার এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, ঐতিহ্যবাহী এই হাটকে কেন্দ্র করে যেকোনো অনিয়ম বন্ধে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
আরোও পড়ুন - কুড়িগ্রামে ভূমিদস্যুদের তাণ্ডব: মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে হামলার হুমকি, ২ জন জেলহাজতে