
মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীতে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নতুন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে সোমবার সকাল থেকে জেলার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আকস্মিক এ পরিস্থিতিতে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। দূরপাল্লার যাত্রী, অফিসগামী মানুষ, রোগী ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, শিরোইল বাসস্ট্যান্ড ও ভদ্রা এলাকায় সকাল থেকেই শত শত যাত্রীকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। পরিবহন সংকটের সুযোগে বিকল্প যানবাহনের ভাড়াও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর এমন অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় জনমনে উদ্বেগও ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, রোববার কেন্দ্রীয় ফেডারেশন থেকে রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি ও মমিনুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্যবিশিষ্ট রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার পরপরই শ্রমিকদের একটি অংশ এই কমিটির বিরোধিতা শুরু করে। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করেই কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে সোমবার ভোর থেকেই রাজশাহীতে বাস বন্ধ কর্মসূচি পালন শুরু হয়। বিভিন্ন রুটে বাস কাউন্টার বন্ধ রাখা হয় এবং অনেক চালক-শ্রমিক যানবাহন নিয়ে সড়কে নামেননি। এতে রাজশাহী থেকে ঢাকাসহ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে যান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, শ্রমিকদের দাবি ও বাস্তবতা বিবেচনা না করেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক নেতাকর্মী বাদ পড়েছেন। তাই শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ঐক্যের প্রশ্নে তারা আপাতত বাস চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সম্ভাবনা কম বলেও জানান তিনি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সমাধান না হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
অন্যদিকে নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় ফেডারেশন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে আলোচনা করেই এই কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি কমিটিতে জায়গা না পাওয়ায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। তবে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এদিকে শ্রমিকদের দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক যাত্রী সকাল থেকে অপেক্ষা করেও গন্তব্যে যেতে না পেরে বাসস্ট্যান্ড থেকেই ফিরে গেছেন। এতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ।
সোমবার সকালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্যে যাত্রার অপেক্ষায় থাকা মানুষ চরম অনিশ্চয়তায় সময় কাটাচ্ছেন। কেউ জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার কথা থাকলেও বাস না পেয়ে বিকল্প পরিবহন খুঁজছেন। আবার কেউ চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন। কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেন, হঠাৎ করে রাজশাহীতে বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা কোনো পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাননি। অনেকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়ায় মাইক্রোবাস, সিএনজি ও ভাড়ায় চালিত ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করছেন। এতে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপও বেড়ে গেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাজশাহীতে এর আগেও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও কমিটি গঠন নিয়ে একাধিকবার বিরোধ দেখা দিয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। শ্রমিকদের একাংশের দাবি, কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে নতুন নেতৃত্বের সমর্থকরা বলছেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করতেই নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফলে রাজশাহীতে বাস বন্ধ পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। সাধারণ যাত্রীরা দ্রুত সমস্যার সমাধান চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও রোগীবাহী যাত্রীরা দ্রুত বাস চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রাজশাহীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান হবে এবং রাজশাহীতে বাস বন্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটবে।
আরোও পড়ুন - রাজশাহীর তানোরে ধানের দামে উঠছে না শ্রমিকের মজুরি, বোরো চাষে বড় লোকসান