
লালমনিরহাট প্রতিনিধি: সোহরাব হোসেন শিমুলঃ
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নে ভয়াবহ ধরলা নদী ভাঙন এখন জনজীবনে এক স্থায়ী আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই নদীর ভয়াল থাবায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা ও গ্রামীণ সড়ক। নদীপাড়ের মানুষজন চোখের সামনে তাদের বাপ-দাদার স্মৃতি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো বারবার ঘর সরিয়ে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছেন ওয়াবদা বাঁধের পাশে কিংবা অন্যের জমিতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে মোগলহাটের কর্ণপুর, ফলিমারী, কুরুল, বুমকা, ইটাপোতা ও খারুয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর তীব্র স্রোতে বিশাল অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একই চিত্র কুলাঘাট ইউনিয়নের চর খাটামারী ও শিবেরকুটিসহ বিভিন্ন এলাকায়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত কয়েক বছরে ভয়াবহ ধরলা নদী ভাঙন অনেক পরিবারকে একাধিকবার বসতভিটা পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। কেউ কেউ তিন থেকে চারবার পর্যন্ত বাড়িঘর সরিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। বর্তমানে অনেক পরিবার অস্থায়ী ছাপড়া ঘরে বসবাস করছেন। নিরাপদ আশ্রয় ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, “আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। এক সময় ১০ বিঘা জমি ছিল, এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইও নেই। নদী প্রতিবার একটু একটু করে সব নিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার সময় পাউবো কিছু জিও ব্যাগ ফেলে চলে যায়, কিন্তু স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয় না।” একই ধরনের অভিযোগ করেন গৃহবধূ রহিমা বেগম। তিনি জানান, নদীভাঙনের কারণে তার পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। এলাকায় কাজের সুযোগ না থাকায় অনেক যুবক বাধ্য হয়ে অন্য জেলায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। স্থানীয়দের মতে, চলমান ধরলা নদী ভাঙন শুধু বসতভিটা ধ্বংস করছে না, পুরো এলাকার অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে তুলছে।
এলাকাবাসীর দাবি, কুলাঘাট থেকে মোগলহাট পর্যন্ত ধরলা নদীতে দ্রুত সুপরিকল্পিত ড্রেজিং কার্যক্রম চালু করতে হবে। তাদের মতে, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ লোকালয়ের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। ফলে প্রতি বছর নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে। পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পলি ও বালু নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। এজন্য ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি ওয়াবদা বাঁধ সিসি ব্লক দিয়ে টেকসইভাবে পুনঃনির্মাণ করা না হলে আগামী কয়েক বছরে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত তরুণদের অভিযোগ, ভাঙনের কারণে কুলাঘাট ও মোগলহাট অঞ্চলে বেকারত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অনেক পরিবার আয়-রোজগারের পথ হারিয়েছে। অনেকেই পরিবার নিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। তারা বলছেন, এই অঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদী খননের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে শুধু ভাঙন রোধই নয়, কৃষি ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। স্থানীয়দের ভাষায়, “ত্রাণ নয়, আমরা স্থায়ী সমাধান চাই।” তাদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভয়াবহ ধরলা নদী ভাঙন ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের জন্য বড় মানবিক সংকট তৈরি করবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে একাধিকবার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও নদী খননের দাবি জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে কুলাঘাট ও মোগলহাট অঞ্চলের লাখো মানুষকে ভাঙনের আতঙ্ক থেকে মুক্ত করবে। তাদের বিশ্বাস, দ্রুত ড্রেজিং ও শক্তিশালী ওয়াবদা বাঁধ নির্মাণ করা গেলে বহু পরিবার আবারও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।
আরোও পড়ুন - লালমনিরহাটে অবৈধ বালু উত্তোলন: খাস জমি দখলে তোজা মিয়ার বালু বাণিজ্যের অভিযোগ