
বগুড়া জেলা প্রতিনিধিঃ
নানা আলোচনা, সমালোচনা, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং একাধিক নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বগুড়ায় এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬। পুরো পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণ, সেট কোড বিভ্রাট, পরীক্ষার্থী বহিষ্কার এবং মাত্র একজন পরীক্ষার্থীর জন্য বিশাল প্রশাসনিক আয়োজনের ঘটনা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার্বিকভাবে পরীক্ষা শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু দায়িত্বহীনতা পুরো জেলার শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
জেলা প্রশাসনের শিক্ষা শাখা সূত্রে জানা গেছে, এবার বগুড়ায় এসএসসি পরীক্ষা ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ৩৭ হাজার ২০১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে এসএসসিতে ২৬ হাজার ৫৮২ জন, দাখিলে ৭ হাজার ৮৯৭ জন, এসএসসি ভোকেশনালে ২ হাজার ৭০২ জন এবং দাখিল ভোকেশনালে অংশ নেয় ২০ জন পরীক্ষার্থী। জেলার ৩৯টি কেন্দ্রে সাধারণ এসএসসি, ১৯টি কেন্দ্রে দাখিল এবং ১৮টি কেন্দ্রে ভোকেশনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একযোগে কাজ করলেও একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয় শেরপুর উপজেলার শহীদিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের ঘটনা। সেখানে ১০১ ও ১০২ নম্বর কক্ষে দাখিল পরীক্ষার্থীদের হাতে ভুলবশত পুরোনো সিলেবাসের এমসিকিউ প্রশ্নপত্র তুলে দেওয়া হয়। এতে অন্তত ২৯ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থী বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়। পরীক্ষা শেষে বিষয়টি জানাজানি হলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে হল সুপারসহ চারজন কক্ষ পরিদর্শককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের খাতা বিশেষ বিবেচনায় মূল্যায়ন করা হবে।
এদিকে সোনাতলা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কেন্দ্রে ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ঘটে আরেক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। নির্ধারিত ‘সেট-১’ এর পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় ‘সেট-৩’ এর প্রশ্নপত্র। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ পেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। উত্তেজিত অভিভাবকরা কেন্দ্রের আসবাবপত্র ভাঙচুর করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে কেন্দ্র সচিবকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ৬৯৮ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদাভাবে মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে যাতে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতির শিকার না হয়।
তবে এবারের বগুড়ায় এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও আলোচিত ঘটনা ঘটে শিবগঞ্জ উপজেলার গুজিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে। সেখানে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন। কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র পরিচালনার সব ব্যবস্থাই রাখতে হয়। একজন পরীক্ষার্থীর জন্য কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন একজন ট্যাগ অফিসার, কেন্দ্র সচিব, কক্ষ পরিদর্শক, সহকারী শিক্ষক, একজন পুলিশ সদস্য এবং দুজন অফিস সহায়কসহ মোট আটজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই এটিকে প্রশাসনিক নিয়মের কঠোর বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ধুনট উপজেলায় এক পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ধুনট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসএসসি ভোকেশনালের পদার্থবিজ্ঞান-২ পরীক্ষা চলাকালে মানিক মিয়া নামের এক শিক্ষার্থীকে নকলসহ হাতেনাতে আটক করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী। পরে পরীক্ষা কেন্দ্রের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে তাকে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতেও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার এবং কেন্দ্র সচিবদের আরও জবাবদিহিতার আওতায় না আনলে এ ধরনের ভুল ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র বিতরণে সমন্বয়হীনতা ও সেট কোড বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। ফলে বগুড়ায় এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে উদ্ভূত ঘটনাগুলো শিক্ষা প্রশাসনের জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী পরীক্ষাগুলো আরও সুশৃঙ্খল ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
পরীক্ষা শেষ হলেও ভুল প্রশ্নপত্র, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনা এখনও থামেনি। তবে শিক্ষা বোর্ডের বিশেষ মূল্যায়ন সিদ্ধান্তে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও নির্ভুল ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আরোও পড়ুন - বগুড়া সিটি কর্পোরেশন প্রশাসক হিসেবে যোগ দিলেন এম আর ইসলাম স্বাধীন