
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার
দক্ষিণ ক্যারোলিনিয়ার এক নির্জন গ্রামীণ সড়কে গভীর রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এখন লাখো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া “ফোরটিন গল্প” শুধু একটি বিড়াল উদ্ধারের কাহিনি নয়, বরং মানবতা, বিশ্বাস ও ভালোবাসার এক অসাধারণ উদাহরণ। রাত তখন আনুমানিক ২টা। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ আর দূরে মাঝে মাঝে বজ্রপাতের আলো। দীর্ঘ ৩১ বছরের অভিজ্ঞ ট্রাকচালক নিজের ট্রাক নিয়ে যাচ্ছিলেন দক্ষিণ ক্যারোলিনিয়ার একটি কৃষিপ্রধান সড়ক ধরে। এমন রাতে সাধারণত রাস্তায় কোনো মানুষ বা প্রাণীর দেখা মেলে না। কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর ট্রাকের হেডলাইটে ধরা পড়ে এক ছোট্ট ভেজা বিড়াল, যে রাস্তার মাঝখানে নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল।
সাধারণ কোনো প্রাণী হলে হয়তো গাড়ির আলো দেখেই পালিয়ে যেত। কিন্তু বিড়ালটি পালালো না। সে দক্ষিণমুখী হয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল দূরে মিলিয়ে যাওয়া একটি গাড়ির পেছনের লাল আলোয়। চালক দ্রুত বুঝতে পারেন, কিছুক্ষণ আগেই কেউ তাকে সেখানে ফেলে রেখে চলে গেছে। ঘটনাটি তাঁকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। ট্রাক থামিয়ে তিনি যখন ভেজা রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বিড়ালটির কাছে যান, তখনও সেটি কোনো ভয় দেখায়নি। বরং অসহায় চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই মুহূর্তের অনুভূতি পরবর্তীতে ট্রাকচালক সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন “ওর চোখে ভয় ছিল না, ছিল বিশ্বাসভঙ্গের কষ্ট।” এই “ফোরটিন গল্প” মানুষের আবেগকে এতটাই নাড়া দেয় যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পোস্টটি হাজার হাজার শেয়ার হতে থাকে।
বিড়ালটির গলায় একটি হালকা নীল রঙের কলার ছিল। তবে কোনো পরিচয়পত্র বা মাইক্রোচিপ পাওয়া যায়নি। কিন্তু পরিষ্কার শরীর, কাটা নখ এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থা দেখে প্রাণী চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন, সে কোনো পথের বিড়াল নয়; বরং একসময় কোনো পরিবারের আদরের পোষ্য ছিল। উদ্ধার করার পর ট্রাকচালক তাকে নিজের ট্রাকের কেবিনে নিয়ে বসান। অবাক করা বিষয় হলো, পুরো পথজুড়ে বিড়ালটি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। যেন সে অপেক্ষা করছিল, কেউ হয়তো ফিরে এসে তাকে আবার নিয়ে যাবে। চালক পরে জানান, সেই দৃষ্টি আজও তিনি ভুলতে পারেননি। কারণ সেখানে ছিল অসীম কষ্ট, ভয় এবং ফেলে যাওয়ার যন্ত্রণা।
উদ্ধারের আগ মুহূর্তে ট্রাকচালক নিজের মোবাইল ফোনে একটি ছবি তুলে রাখেন। পরে সেই ছবিই ট্রাকারদের একটি অনলাইন ফোরামে পোস্ট করা হলে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ ছবিটি দেখে আবেগাপ্লুত হন। অনেকেই মন্তব্য করেন, প্রাণীরাও মানুষের মতোই অনুভব করতে পারে ভালোবাসা ও পরিত্যাগের কষ্ট। এদিকে ফস্টার হোমে নেওয়ার পর বিড়ালটি টানা পাঁচ দিন কিছু খায়নি। খাঁচার এক কোণে মুখ লুকিয়ে চুপচাপ বসে থাকত। কেবল বাইরে গাড়ির শব্দ শুনলেই আচমকা দরজার দিকে তাকাত। যেন সে ভাবত, যে মানুষ তাকে ফেলে গেছে, সে হয়তো ফিরে আসবে। “ফোরটিন গল্প” এখানেই আরও বেশি হৃদয়স্পর্শী হয়ে ওঠে।
ছয় দিনের মাথায় সেই ট্রাকচালক আবার ফোন করে খোঁজ নেন। যখন জানতে পারেন এখনো কেউ বিড়ালটিকে নিতে আসেনি, তখন তিনি আর দেরি করেননি। চার ঘণ্টার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আবার ছুটে যান ফস্টার হোমে। খাঁচার দরজা খোলার পর ঘটে এক আবেগঘন মুহূর্ত। ছোট্ট বিড়ালটি ধীরে ধীরে তাঁর কোলে উঠে বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলে। যেন সে বুঝে গিয়েছিল এই মানুষটি তাকে আর ফেলে যাবে না। ১৪ ফেব্রুয়ারির সেই রাতের স্মৃতি ধরে রাখতেই চালক তার নাম দেন “ফোরটিন”। তিনি চেয়েছিলেন, দিনটি যেন কষ্টের স্মৃতি হয়ে না থাকে; বরং নতুন জীবনের শুরু হিসেবে মনে থাকে। এরপর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে “ফোরটিন গল্প” নতুনভাবে আলোচনায় আসে।
বর্তমানে ফোরটিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় ট্রাকচালকের শান্ত ও সুন্দর বাড়িতে থাকে। জানালার পাশে তার আলাদা বিছানা, খেলনা আর খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আজও একটি অভ্যাস বদলায়নি। চালক যখনই বাড়ির বাইরে যান, ফোরটিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। যতক্ষণ না তিনি ফিরে আসেন, ততক্ষণ তার চোখ দরজার দিকেই স্থির থাকে। প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিত্যক্ত প্রাণীদের মধ্যে এমন মানসিক আঘাত দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। ভালোবাসা পেলেও তারা বারবার নিশ্চিত হতে চায় আবার কেউ তাদের ছেড়ে চলে যাবে না তো?
এই ঘটনাটি এখন বিশ্বজুড়ে মানবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলছেন, পৃথিবী পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি বলেই এখনো এমন মানুষদের দেখা মেলে। কেউ একজন ফেলে দিলেও, আরেকজন নিজের সব ব্যস্ততা ভুলে নেমে আসে আশ্রয় হয়ে। “ফোরটিন গল্প” তাই কেবল একটি ভাইরাল পোস্ট নয়; এটি মনে করিয়ে দেয় নীরব ভালোবাসা কখনো কখনো একটি প্রাণের পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারে।
[ বিঃ দ্রঃ প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জাহানারা শাওন (Jahanara Shaon) এর একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহৃত হয়েছে মরহুম আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘সেই তুমি’-র ইন্সট্রুমেন্টাল সুর। ]
আরোও পড়ুন - ইতালির ঘাঁটি ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে না: ইউরোপে নতুন বার্তা