
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টারঃ
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঢাকার দোহার উপজেলার পশুর হাটগুলোতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশেষ করে পদ্মা নদী সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মেঘুলা বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে দোহারের হাট। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাটজুড়ে চলছে গরু ও ছাগল কেনাবেচা। সড়ক পথের পাশাপাশি নদীপথে বড় বড় ট্রলারে করে বিভিন্ন জেলা থেকে পশু আসতে শুরু করায় পুরো এলাকা এখন সরগরম হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, এবার ঈদ উপলক্ষে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিসরে জমে উঠেছে এই হাট।
পদ্মা নদীপথ ব্যবহার করে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, সদরপুর, চরভদ্রাসন ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে ব্যাপারীরা ট্রলার বোঝাই গরু নিয়ে মেঘুলা বাজারে ভিড় করছেন। নদীপথে পরিবহন খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং পশুর শারীরিক ধকল কম লাগায় ব্যবসায়ীরা এই রুটকে বেশি নিরাপদ ও লাভজনক মনে করছেন। ফরিদপুর থেকে আসা এক গরু ব্যবসায়ী জানান, ট্রলারে করে একসাথে অনেক গরু আনা যায় এবং সড়কের যানজট বা অতিরিক্ত খরচের ঝামেলাও থাকে না। তিনি আরও বলেন, মেঘুলা বাজারের ক্রেতারা দেশি গরুর ভালো মূল্য দেওয়ায় প্রতি বছরই তারা এখানে পশু নিয়ে আসেন।
এবারের দোহারের হাট-এ মাঝারি ও ছোট আকারের দেশি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। পদ্মার চরাঞ্চলে প্রাকৃতিক ঘাস খেয়ে বেড়ে ওঠা সুঠাম স্বাস্থ্যের গরুগুলো ক্রেতাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। হাটে আসা অনেক ক্রেতা জানান, তারা খামারে প্রাকৃতিকভাবে লালন-পালন করা দেশি গরুকেই কোরবানির জন্য বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিক সংকটের কারণে এবার গরুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তবুও ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেঘুলা ঘাট এলাকায় ট্রলার থেকে সারিবদ্ধভাবে গরু নামানোর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছেন। স্থানীয়দের অনেকে পরিবার নিয়ে নদীপাড়ে এসে এই দৃশ্য উপভোগ করছেন। শুধু বাইরের ব্যবসায়ীরাই নয়, দোহারের স্থানীয় খামারিরাও এবার বড় প্রস্তুতি নিয়ে হাটে নেমেছেন। উপজেলার স্থানীয় খামারি শাহীন মোল্লা জানান, তার খামারে কোরবানির উপযোগী মোট ৪০টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিনে ২০টি গরু হাটে এনেছেন এবং পরদিন আরও ২০টি গরু আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আশা করছেন, ঈদের আগের দুই দিনে বিক্রি সবচেয়ে বেশি হবে।
গরুর পাশাপাশি ছাগলের বাজারও এবার বেশ জমজমাট। বিশেষ করে চরজয়পাড়া এলাকার তরুণ ব্যবসায়ী সম্রাটের ছাগলের বিশাল সংগ্রহ ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিনি এবার যশোর থেকে প্রায় ২০০টি ছাগল এনে মেঘুলা বাজারে তুলেছেন। বিভিন্ন জাতের ছোট-বড় ছাগল দেখতে হাটে আগত দর্শনার্থীদেরও আগ্রহ দেখা গেছে। সম্রাট জানান, গত বছরের তুলনায় এবার চাহিদা ভালো এবং শেষ মুহূর্তে দাম আরও বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করছেন।
হাটের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও ইজারাদার পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। মেঘুলা বাজার হাটের ইজারাদার ভুলু খালাসি জানান, হাটে তাদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করছে এবং পুলিশ প্রশাসন সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে। জাল টাকা প্রতিরোধে স্থাপন করা হচ্ছে বিশেষ শনাক্তকরণ বুথ। এছাড়া অজ্ঞান পার্টি, চাঁদাবাজি ও প্রতারণা ঠেকাতে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের মেডিকেল টিমও পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে।
সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টির কারণে কয়েকদিন হাটের কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হলেও আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় এখন পুরোদমে জমে উঠেছে দোহারের হাট। উপজেলার জয়পাড়া বড় মাঠ ও কার্তিকপুর হাটেও প্রতিদিন বাড়ছে পশুর আমদানি। চাকরিজীবী ও শহরাঞ্চলের ক্রেতারা বিকেলের পর হাটে বেশি ভিড় করছেন। ব্যবসায়ীদের ধারণা, সোমবার থেকে বুধবার রাত পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ কেনাবেচা হতে পারে। নদী ও সড়ক দুই পথেই পশুর ব্যাপক আমদানির কারণে এবার দোহারের পশুর হাটগুলো ঈদ বাজারের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরোও পড়ুন - শাহজাদপুর পশুর হাটে জমজমাট বেচাকেনা, দেশি গরুতে ক্রেতাদের আগ্রহ