গোদাগাড়ী সমবায় কর্মকর্তা কারাদণ্ড, ঘুষ মামলায় ৫ বছরের সাজা

মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীর আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলায় উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নৃপেন্দ্রনাথ দাসকে মোট ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ফাঁদ মামলায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রোববার দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে আদালত তাকে অর্থদণ্ডও প্রদান করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এ রায়কে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোস্তফা পাভেল রায়হান রায়ে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ২ মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেন। পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় আরও ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৮ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে অতিরিক্ত ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের এ রায়ের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলার বিচারিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৪ মে গোদাগাড়ী পৌর সদরের সরমঙ্গলা একতা মৎস্য চাষী সমবায় সমিতির নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন আব্দুল বাতেন নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তৎকালীন উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নৃপেন্দ্রনাথ দাস তার কাছে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। সরকারি সেবা পেতে বাধ্য হয়ে অভিযোগকারী প্রথমে ৭ হাজার টাকা প্রদান করেন। পরে বাকি টাকা দিতে চাপ সৃষ্টি করা হলে তিনি বিষয়টি দুদকের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ে অবহিত করেন।

এরপর দুদক পরিকল্পিতভাবে ফাঁদ অভিযান পরিচালনা করে। একইদিন দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে বসে অবশিষ্ট ৮ হাজার টাকা গ্রহণের সময় দুদকের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোরশেদ আলমের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি টিম অভিযান চালায়। এ সময় ঘুষের টাকা গ্রহণরত অবস্থায় নৃপেন্দ্রনাথ দাসকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাকে গোদাগাড়ী থানায় সোপর্দ করা হয় এবং এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জব্দকৃত আলামত সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হওয়ায় মামলাটি শক্ত অবস্থানে ছিল। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলায় আদালতের এই রায় সরকারি দপ্তরে ঘুষ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজশাহী জেলা সমন্বিত দুদকের সহকারী পরিচালক আমির হোসেন বলেন, গোদাগাড়ী থানার ফাঁদ মামলা নম্বর-২৬ থেকে উদ্ভূত বিশেষ মামলা নম্বর-০১/২০২০-এ আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে প্রমাণিত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি আরও জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে এ ধরনের মামলায় কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি অফিসে সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানি ও ঘুষের শিকার না হন, সেজন্য প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের দপ্তরগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ফাঁদ মামলা ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তাদের মতে, আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলার রায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা আরও বৃদ্ধি করবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ঘুষ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সাহস করে অভিযোগ করলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে। একইসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে। তারা মনে করেন, একজন ভুক্তভোগীর সাহসী পদক্ষেপের কারণেই এই মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও আরও শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

আরোও পড়ুন – রাজশাহীর তানোরে ধানের দামে উঠছে না শ্রমিকের মজুরি, বোরো চাষে বড় লোকসান

গোদাগাড়ী সমবায় কর্মকর্তা কারাদণ্ড, ঘুষ মামলায় ৫ বছরের সাজা

মে ১৮, ২০২৬

মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীর আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলায় উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নৃপেন্দ্রনাথ দাসকে মোট ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ফাঁদ মামলায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রোববার দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে আদালত তাকে অর্থদণ্ডও প্রদান করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এ রায়কে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোস্তফা পাভেল রায়হান রায়ে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ২ মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেন। পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় আরও ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৮ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে অতিরিক্ত ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের এ রায়ের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলার বিচারিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৪ মে গোদাগাড়ী পৌর সদরের সরমঙ্গলা একতা মৎস্য চাষী সমবায় সমিতির নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন আব্দুল বাতেন নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তৎকালীন উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নৃপেন্দ্রনাথ দাস তার কাছে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। সরকারি সেবা পেতে বাধ্য হয়ে অভিযোগকারী প্রথমে ৭ হাজার টাকা প্রদান করেন। পরে বাকি টাকা দিতে চাপ সৃষ্টি করা হলে তিনি বিষয়টি দুদকের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ে অবহিত করেন।

এরপর দুদক পরিকল্পিতভাবে ফাঁদ অভিযান পরিচালনা করে। একইদিন দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে বসে অবশিষ্ট ৮ হাজার টাকা গ্রহণের সময় দুদকের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোরশেদ আলমের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের একটি টিম অভিযান চালায়। এ সময় ঘুষের টাকা গ্রহণরত অবস্থায় নৃপেন্দ্রনাথ দাসকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাকে গোদাগাড়ী থানায় সোপর্দ করা হয় এবং এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জব্দকৃত আলামত সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হওয়ায় মামলাটি শক্ত অবস্থানে ছিল। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলায় আদালতের এই রায় সরকারি দপ্তরে ঘুষ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজশাহী জেলা সমন্বিত দুদকের সহকারী পরিচালক আমির হোসেন বলেন, গোদাগাড়ী থানার ফাঁদ মামলা নম্বর-২৬ থেকে উদ্ভূত বিশেষ মামলা নম্বর-০১/২০২০-এ আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে প্রমাণিত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি আরও জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে এ ধরনের মামলায় কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি অফিসে সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানি ও ঘুষের শিকার না হন, সেজন্য প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের দপ্তরগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ফাঁদ মামলা ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তাদের মতে, আলোচিত গোদাগাড়ী ঘুষ মামলার রায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা আরও বৃদ্ধি করবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ঘুষ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সাহস করে অভিযোগ করলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে। একইসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে। তারা মনে করেন, একজন ভুক্তভোগীর সাহসী পদক্ষেপের কারণেই এই মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও আরও শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

আরোও পড়ুন – রাজশাহীর তানোরে ধানের দামে উঠছে না শ্রমিকের মজুরি, বোরো চাষে বড় লোকসান