মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। স্থানীয় বাজারে ধানের দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না অনেক চাষি। মাঠে ধান ভালো হলেও বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের এক দিনের মজুরি উঠছে না। এতে বোরো চাষ নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে জমিতে ধান আবাদ কমে যেতে পারে।
বর্তমানে তানোরের বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৮৩০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে। কিন্তু ধান কাটতে একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। শুধু কাটাই নয়, ধান মাড়াই, বহন ও শুকানোর খরচও বেড়েছে। ফলে ধানের দাম কম থাকলেও কৃষকের খরচ বাড়ছে প্রতিদিন। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে এবার উৎপাদন ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে।
ফারুক নামের এক কৃষক জানান, তার ২৪ কাঠা জমির ধান কাটতে ৮ জন শ্রমিক কাজ করেছেন। প্রত্যেককে ১২০০ টাকা করে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ধান ফলেছে ভালো, কিন্তু বাজারে বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠছে না। একই অভিযোগ করেন তোফা নামের আরেক কৃষক। তিনি সাড়ে ৭ বিঘা জমির ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। এখন বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছেন। কারণ ঘরে ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এবার বাইরের এলাকা থেকে পর্যাপ্ত শ্রমিক না আসায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অনেক জমির ধান পেকে মাটিতে নুয়ে পড়ায় দ্রুত কাটার চাপ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগে শ্রমিকরা আগের চেয়ে বেশি মজুরি নিচ্ছেন। আগে চুক্তিভিত্তিক ধান কাটার প্রচলন থাকলেও এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দৈনিক মজুরিতে কাজ হচ্ছে। এতে কৃষকের ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। অনেক কৃষক সময়মতো শ্রমিক না পেয়ে নিজেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাঠে নামছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকাম থেকে বড় পাইকাররা কম আসছেন। জ্বালানি খরচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাজারে ধানের চাহিদা কমেছে। ফলে ধানের দাম বাড়ছে না। কৃষকদের মতে, বাজারে ধানের দাম কম হলেও চালের দাম তেমন কমেনি। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও উৎপাদক কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা মনে করেন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনলে বাজারে কিছুটা ভারসাম্য ফিরতে পারে।

শাকির নামের এক কৃষক তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সব হিসাব শেষে বিঘাপ্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে কখনও আলু, কখনও ধান কোনোটাতেই ঠিকমতো লাভ নেই। কৃষক যদি ফসলের দাম না পায়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে কৃষি থেকে সরে যাবে। তার মতো অনেক লিজ চাষি এখন ঋণ পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন।
কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে সরাসরি ধান সংগ্রহ বাড়ানো হোক। নির্ধারিত দামে দ্রুত কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হলে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কৃষকরা বেশি বিপদে পড়েছেন। তারা বলছেন, বাজারে ধানের দাম কমে গেলে তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ঋণের কিস্তি, পরিবারের খরচ এবং পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতি সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ জানান, তানোরে এবার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। বিলকুমারী বিলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় আগাম আবাদ হওয়ায় অনেক জায়গায় এখন কাটার ধুম চলছে। বিঘাপ্রতি গড়ে ২৫ থেকে ৩০ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ জমির ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে কৃষকেরা বলছেন, ফলন ভালো হলেও ধানের দাম না বাড়লে সেই সাফল্য তাদের কোনো কাজে আসবে না।
আরোও পড়ুন – নাসিরনগর ধান ডুবি: ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরে কৃষকের কান্না
রাজশাহীর তানোরে ধানের দামে উঠছে না শ্রমিকের মজুরি, বোরো চাষে বড় লোকসান
মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। স্থানীয় বাজারে ধানের দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না অনেক চাষি। মাঠে ধান ভালো হলেও বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের এক দিনের মজুরি উঠছে না। এতে বোরো চাষ নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে জমিতে ধান আবাদ কমে যেতে পারে।
বর্তমানে তানোরের বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৮৩০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে। কিন্তু ধান কাটতে একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। শুধু কাটাই নয়, ধান মাড়াই, বহন ও শুকানোর খরচও বেড়েছে। ফলে ধানের দাম কম থাকলেও কৃষকের খরচ বাড়ছে প্রতিদিন। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে এবার উৎপাদন ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে।
ফারুক নামের এক কৃষক জানান, তার ২৪ কাঠা জমির ধান কাটতে ৮ জন শ্রমিক কাজ করেছেন। প্রত্যেককে ১২০০ টাকা করে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ধান ফলেছে ভালো, কিন্তু বাজারে বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠছে না। একই অভিযোগ করেন তোফা নামের আরেক কৃষক। তিনি সাড়ে ৭ বিঘা জমির ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। এখন বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছেন। কারণ ঘরে ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এবার বাইরের এলাকা থেকে পর্যাপ্ত শ্রমিক না আসায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অনেক জমির ধান পেকে মাটিতে নুয়ে পড়ায় দ্রুত কাটার চাপ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগে শ্রমিকরা আগের চেয়ে বেশি মজুরি নিচ্ছেন। আগে চুক্তিভিত্তিক ধান কাটার প্রচলন থাকলেও এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দৈনিক মজুরিতে কাজ হচ্ছে। এতে কৃষকের ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। অনেক কৃষক সময়মতো শ্রমিক না পেয়ে নিজেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাঠে নামছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকাম থেকে বড় পাইকাররা কম আসছেন। জ্বালানি খরচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাজারে ধানের চাহিদা কমেছে। ফলে ধানের দাম বাড়ছে না। কৃষকদের মতে, বাজারে ধানের দাম কম হলেও চালের দাম তেমন কমেনি। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও উৎপাদক কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা মনে করেন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনলে বাজারে কিছুটা ভারসাম্য ফিরতে পারে।

শাকির নামের এক কৃষক তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সব হিসাব শেষে বিঘাপ্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে কখনও আলু, কখনও ধান কোনোটাতেই ঠিকমতো লাভ নেই। কৃষক যদি ফসলের দাম না পায়, তাহলে মানুষ ধীরে ধীরে কৃষি থেকে সরে যাবে। তার মতো অনেক লিজ চাষি এখন ঋণ পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন।
কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে সরাসরি ধান সংগ্রহ বাড়ানো হোক। নির্ধারিত দামে দ্রুত কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হলে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কৃষকরা বেশি বিপদে পড়েছেন। তারা বলছেন, বাজারে ধানের দাম কমে গেলে তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ঋণের কিস্তি, পরিবারের খরচ এবং পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতি সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ জানান, তানোরে এবার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। বিলকুমারী বিলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় আগাম আবাদ হওয়ায় অনেক জায়গায় এখন কাটার ধুম চলছে। বিঘাপ্রতি গড়ে ২৫ থেকে ৩০ মণ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ জমির ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে কৃষকেরা বলছেন, ফলন ভালো হলেও ধানের দাম না বাড়লে সেই সাফল্য তাদের কোনো কাজে আসবে না।
আরোও পড়ুন – নাসিরনগর ধান ডুবি: ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরে কৃষকের কান্না