
মাহফুজুর রহমান, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধিঃ
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর, রামগতি ও রায়পুর উপজেলাজুড়ে ভয়াবহ ভাতা প্রতারণাের অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন ভাতা, ঘর ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চক্রটির মূলহোতা তাহমিনা আক্তার লিমা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে প্রতারণা চালিয়ে আসছিলেন। বর্তমানে তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শত শত পরিবার চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত তাহমিনা আক্তার লিমা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে নিজেকে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি দাবি করতেন, তার বিশেষ যোগাযোগের মাধ্যমে খুব সহজেই সরকারি ঘর, শিশু ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তার কথায় বিশ্বাস করে স্থানীয় বহু মানুষ জনপ্রতি কয়েক হাজার টাকা করে তার হাতে তুলে দেন। কেউ কেউ ধারদেনা করে, আবার কেউ গবাদিপশু বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছেন বলেও জানিয়েছেন। এভাবেই কয়েক মাসের ব্যবধানে বড় ধরনের ভাতা প্রতারণা সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, শিশু ভাতার জন্য ৪ হাজার টাকা, বয়স্ক ভাতার জন্য ৪ হাজার টাকা, মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য ৫ হাজার টাকা এবং টয়লেট নির্মাণের নামে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। টাকা নেওয়ার সময় দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও সাত থেকে আট মাস পেরিয়ে গেলেও কেউ কোনো সুবিধা পাননি। পরে টাকা ফেরত চাইতে গেলে শুরু হয় নানা টালবাহানা ও সময়ক্ষেপণ। অনেককে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত একটি ভাতা প্রতারণা চক্রের অংশ।
এ ঘটনায় নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে যখন ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন, অভিযুক্ত লিমার ছোট ভাই মোঃ তানভীর হোসেন ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে দুই মাস সময় নেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যেভাবেই হোক সবার টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ের মধ্যেই পরিবারের আরেক সদস্য তারেক হোসেনকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রতারিত পরিবারগুলোর মধ্যে আরও হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে টাকা আত্মসাতের পর পুরো পরিবার এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মূল অভিযুক্ত তাহমিনা আক্তার লিমা বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আসছেন না। এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠার পরও তাকে গ্রেফতার করা না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকায় প্রতারক চক্রটি এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। তাদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের টাকা উদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে।
ঘটনার আরও চাঞ্চল্যকর দিক হলো, নিজেদের রক্ষার জন্য প্রতারক চক্রটি কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, মামলাটির কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এমনকি যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন তারা মামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না। কেউ কেউ বলেছেন, তাদের অনুমতি ছাড়াই সাক্ষী হিসেবে নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এতে পুরো ঘটনায় নতুন রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, মূল ঘটনা আড়াল করতে বিভ্রান্তিকর কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী শাহনাজ বেগম বলেন, “আমাদের অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছে। এখন টাকা চাইতে গেলে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত বিচার চাই।” তিনি আরও জানান, প্রতারণার শিকার বহু পরিবার বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেউ ধারদেনার চাপে রয়েছেন, আবার কেউ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। পুরো এলাকায় এখন আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এ ঘটনায় রামগতি উপজেলার পূর্ব চর সীতা গ্রামের মনির আহমেদের মেয়ে শাহনাজ বেগম বাদী হয়ে লক্ষ্মীপুর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার নম্বর সিআর মামলা নং-১০২, তারিখ: ১৬/০৩/২০২৬ ইং। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে মূলহোতাসহ জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনবে। একইসঙ্গে প্রতারণার শিকার শত শত পরিবারের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে পুরো এলাকায় এই ভাতা প্রতারণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
আরোও পড়ুন - প্রায় অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা প্রতারক আফসারা আফরোজ