
সামাউন সাদমান আশিক,প্রতিনিধি ঢাকা দক্ষিণঃ
দেশে বর্তমানে হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৩৪১ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে রোগটির বিস্তার বেশি হওয়ায় পরিবারগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১১ মে ২০২৬) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ১১ মে সকাল পর্যন্ত দেশে হামের পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে খারাপের দিকে গেছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা ৬৫ জন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া মোট হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৩৭ জনে। এছাড়া সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজার ৫০০ জনে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, চলমান হাম সংক্রমণ মোকাবিলায় দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অনেক বেড়ে গেছে। গত প্রায় দুই মাসে ৩৫ হাজার ৯৮০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩১ হাজার ৯৯২ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও এখনও হাজার হাজার শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত রোগীর চাপ দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবের কারণেই হাম সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই এটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি সেখানে বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি স্কুল, মাদরাসা ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অভিভাবকদের শিশুদের পূর্ণ ডোজ টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর টিকাদানই পারে বর্তমান হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।
চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, শিশুদের শরীরে জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি এবং ত্বকে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ রাখা হয়েছে যাতে রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি না হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায় শিশুদের জন্য এই সংক্রমণ আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
আরোও পড়ুন - শিশুদের সুরক্ষায় হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন শুরু