রাজশাহীতে গ্রাম আদালত সক্রিয়: ২৬ মাসে নিষ্পত্তি ৯ হাজার মামলা

মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও সহজ বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গ্রাম আদালত রাজশাহী কার্যক্রম। মাত্র ২৬ মাসে জেলার ৯টি উপজেলার ৭২টি ইউনিয়নে ৯ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র বিরোধ দ্রুত সমাধান হওয়ায় উচ্চ আদালতের ওপর চাপও কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শনিবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত অর্ধবার্ষিক সমন্বয় সভায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

‘বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (তৃতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, গ্রাম আদালত রাজশাহী উদ্যোগ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। স্থানীয়ভাবে ফৌজদারি ও দেওয়ানি ধরনের ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় জনগণের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকছে এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, গ্রাম আদালত শক্তিশালী করা গেলে জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে দূরে থাকবে। নারী, জাতিগত সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য এই আদালত বিশেষভাবে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। তিনি সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, গ্রাম আদালতের রায় যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ দ্রুত বিচার পেয়ে উপকৃত হয়। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে বিচার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো: মহিনুল হাসান। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত রাজশাহীতে মোট ৯ হাজার ২২০টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি দায়ের করা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৯টি মামলা এবং জেলা আদালত থেকে পাঠানো হয়েছে ৭৭১টি মামলা। দাখিল হওয়া মামলার মধ্যে পুরুষ আবেদনকারী ছিলেন ৬ হাজার ৫২৮ জন এবং নারী আবেদনকারী ছিলেন ২ হাজার ৬৯২ জন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, গ্রাম আদালত রাজশাহী কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপস্থাপিত তথ্যে আরও জানানো হয়, দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে ৯ হাজার ৪২টি মামলা ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট মামলার প্রায় ৯৮ শতাংশ। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে মাত্র ২০৮টি মামলা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি হওয়ায় সাধারণ মানুষ দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত খরচ থেকে রেহাই পাচ্ছেন। বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত ক্ষুদ্র বিরোধ ও সামাজিক দ্বন্দ্ব মীমাংসায় গ্রাম আদালতের কার্যকারিতা বাড়ছে। এছাড়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ২ হাজার ৩৩৪ জন নারী সরাসরি ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলেও সভায় জানানো হয়।

সভায় গ্রাম আদালতের সুবিধাভোগীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ভিডিওতে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসায় থানায় বা আদালতে যেতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল ছিল। এখন ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েই দ্রুত সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। এতে সামাজিক সম্পর্কও আগের তুলনায় ভালো থাকছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রাম আদালত রাজশাহী মডেল দেশের অন্যান্য জেলার জন্যও একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে।

সভা শেষে গ্রাম আদালত কার্যক্রমে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনটি উপজেলা ও আটটি ইউনিয়ন পরিষদকে পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে দুর্গাপুর প্রথম, বাগমারা দ্বিতীয় এবং পুঠিয়া তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গোবিন্দপাড়া, নিমপাড়া, বানেশ্বর, পারিলা, দেলুয়া বাড়ী, নওপাড়া, তালন্দ ও দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ পুরস্কৃত হয়। আয়োজকরা জানান, এই স্বীকৃতি মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীলতা ও সেবার মান আরও বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সভাপতির বক্তব্যে মো: মহিনুল হাসান বলেন, জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিচারপ্রার্থীদের আস্থা ধরে রাখতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আরোও পড়ুন – ডিবির অভিযানে রাজশাহীতে চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার, গ্রেফতার ২

রাজশাহীতে গ্রাম আদালত সক্রিয়: ২৬ মাসে নিষ্পত্তি ৯ হাজার মামলা

মে ২৪, ২০২৬

মোস্তাফিজুর রহমান রানা, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ

রাজশাহীতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও সহজ বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গ্রাম আদালত রাজশাহী কার্যক্রম। মাত্র ২৬ মাসে জেলার ৯টি উপজেলার ৭২টি ইউনিয়নে ৯ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র বিরোধ দ্রুত সমাধান হওয়ায় উচ্চ আদালতের ওপর চাপও কমছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শনিবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত অর্ধবার্ষিক সমন্বয় সভায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

‘বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (তৃতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, গ্রাম আদালত রাজশাহী উদ্যোগ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। স্থানীয়ভাবে ফৌজদারি ও দেওয়ানি ধরনের ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় জনগণের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকছে এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, গ্রাম আদালত শক্তিশালী করা গেলে জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে দূরে থাকবে। নারী, জাতিগত সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য এই আদালত বিশেষভাবে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। তিনি সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, গ্রাম আদালতের রায় যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ দ্রুত বিচার পেয়ে উপকৃত হয়। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে বিচার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো: মহিনুল হাসান। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত রাজশাহীতে মোট ৯ হাজার ২২০টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি দায়ের করা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৯টি মামলা এবং জেলা আদালত থেকে পাঠানো হয়েছে ৭৭১টি মামলা। দাখিল হওয়া মামলার মধ্যে পুরুষ আবেদনকারী ছিলেন ৬ হাজার ৫২৮ জন এবং নারী আবেদনকারী ছিলেন ২ হাজার ৬৯২ জন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, গ্রাম আদালত রাজশাহী কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপস্থাপিত তথ্যে আরও জানানো হয়, দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে ৯ হাজার ৪২টি মামলা ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট মামলার প্রায় ৯৮ শতাংশ। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে মাত্র ২০৮টি মামলা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি হওয়ায় সাধারণ মানুষ দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত খরচ থেকে রেহাই পাচ্ছেন। বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত ক্ষুদ্র বিরোধ ও সামাজিক দ্বন্দ্ব মীমাংসায় গ্রাম আদালতের কার্যকারিতা বাড়ছে। এছাড়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ২ হাজার ৩৩৪ জন নারী সরাসরি ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলেও সভায় জানানো হয়।

সভায় গ্রাম আদালতের সুবিধাভোগীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ভিডিওতে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসায় থানায় বা আদালতে যেতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল ছিল। এখন ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েই দ্রুত সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। এতে সামাজিক সম্পর্কও আগের তুলনায় ভালো থাকছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রাম আদালত রাজশাহী মডেল দেশের অন্যান্য জেলার জন্যও একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে।

সভা শেষে গ্রাম আদালত কার্যক্রমে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনটি উপজেলা ও আটটি ইউনিয়ন পরিষদকে পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে দুর্গাপুর প্রথম, বাগমারা দ্বিতীয় এবং পুঠিয়া তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গোবিন্দপাড়া, নিমপাড়া, বানেশ্বর, পারিলা, দেলুয়া বাড়ী, নওপাড়া, তালন্দ ও দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ পুরস্কৃত হয়। আয়োজকরা জানান, এই স্বীকৃতি মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীলতা ও সেবার মান আরও বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সভাপতির বক্তব্যে মো: মহিনুল হাসান বলেন, জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিচারপ্রার্থীদের আস্থা ধরে রাখতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আরোও পড়ুন – ডিবির অভিযানে রাজশাহীতে চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার, গ্রেফতার ২