সাদ্দাম হোসেন সাইফ | বিশেষ প্রতিনিধি : (বান্দরবান)
বান্দরবানের লামা উপজেলার ৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, একটি সাধারণ সনদ পেতেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপির পাশাপাশি নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়িত করে জমা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে জন্মনিবন্ধন, জমির খতিয়ান, বিদ্যুৎ বিল, হোল্ডিং ট্যাক্সের কাগজসহ একাধিক নথি সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা থাকায় সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে ইউনিয়নের দুর্গম এলাকার নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নাগরিক সনদ পেতে ৯ ধরনের কাগজপত্রের নির্দেশনা
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত আবেদন ফরমে জাতীয়তা সনদ, প্রত্যয়নপত্র, বিশেষ প্রত্যয়ন ও ভূমিহীন সনদ সংগ্রহের জন্য আবেদনকারীদের মোট ৯ ধরনের কাগজপত্র সংযুক্ত করতে বলা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, নির্বাচন অফিস কর্তৃক সত্যায়িত এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি, জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি, ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক সত্যায়িত জন্মনিবন্ধনের ভেরিফিকেশন কপি এবং পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা মৃত্যু সনদের ফটোকপি। এ ছাড়া নিজ, পিতা-মাতা কিংবা দাদা-দাদির জমির খতিয়ান অথবা ভূমিহীন সনদ, বিদ্যুৎ বিল, হাল সনের হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের কাগজ এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি চাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
আবেদনপত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য এবং সাধারণ সদস্যের স্বাক্ষর ও সিল সংগ্রহের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সাধারণ নাগরিক সনদের জন্য এতগুলো নথি বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? যাঁদের বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নিজস্ব জমি নেই কিংবা জমির খতিয়ান সংগ্রহের সুযোগ নেই, তাঁরা কীভাবে এসব শর্ত পূরণ করবেন? বিশেষ করে অন্যের জমিতে বসবাসকারী পরিবার কিংবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে সেবা পাওয়া আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এনআইডি সত্যায়ন নিয়ে বাড়তি প্রশ্ন
স্থানীয়দের অসন্তোষের অন্যতম কারণ নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়িত করার বিষয়টি। তাঁদের ভাষ্য, জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারি ব্যবস্থা থাকার পরও আলাদা করে নির্বাচন অফিসে গিয়ে সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে ইউনিয়ন পরিষদ ও নির্বাচন অফিসের মধ্যে একাধিকবার যাতায়াত করতে হয়। দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত যাতায়াত সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে সাধারণ আবেদনকারীকে কেন একাধিক দপ্তরে যেতে হবে?
এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাইয়ের জন্য পৃথক আবেদন ফরম রয়েছে। সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও প্রবিধানমালায় উল্লেখ আছে। তবে এসব বিধান থেকে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের প্রতিটি নাগরিক সনদের আবেদনে নির্বাচন অফিসের সত্যায়িত ভেরিফিকেশন কপি বাধ্যতামূলক—এমন কোনো সর্বজনীন নির্দেশনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয় পরিষদের এই শর্তের পেছনে নির্দিষ্ট সরকারি পরিপত্র, প্রশাসনিক নির্দেশনা কিংবা স্থানীয় সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
দুর্গম এলাকায় যাতায়াতেই বাড়ছে ব্যয়
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা, বনফুর, কুমারী, ত্রিশডেবা, গয়ালমারা ও সাপেরঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে একটি সনদ সংগ্রহের জন্য কয়েক দফা যাতায়াত করতে গিয়ে তাঁদের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকার বাসিন্দাদের মোটরসাইকেল ভাড়া করে চলাচল করতে হয়। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক হাজার টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে; দূরবর্তী এলাকা থেকে একাধিক দপ্তরে যাতায়াত করলে তা দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এসব ব্যয়ের পরিমাণ এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, যাঁদের দৈনিক আয় সীমিত, তাঁদের জন্য শুধু কাগজপত্র সংগ্রহ করতেই কয়েক দিনের উপার্জন ব্যয় হয়ে যেতে পারে। কোনো পরিবারের বিদ্যুৎ বিল না থাকলে, জমির মালিকানা না থাকলে কিংবা প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে আবেদনপ্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নাগরিক সনদসহ প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিকল্প প্রমাণপত্র গ্রহণ, স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই এবং একাধিক দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
অনিয়ম প্রতিরোধ, নাকি সাধারণ মানুষের বাড়তি ভোগান্তি?
স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন, ভুয়া পরিচয়, জাল কাগজপত্র কিংবা অনিয়ম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে কোন নির্দিষ্ট অনিয়ম ঠেকাতে এই প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে, তা আবেদনকারীদের কাছে পরিষ্কার নয়। তাঁদের মতে, পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যাচাইয়ের নামে প্রকৃত নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি করা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি ভুয়া তথ্য দিয়ে সনদ সংগ্রহ করেছেন—এমন অভিযোগ থাকলে তা নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটিও যথাযথভাবে তদন্ত করা উচিত।
বিশেষ করে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, জাল নথি জমা কিংবা অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিকে সনদ দেওয়ার মতো অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, অনিয়ম বন্ধের দায়িত্ব প্রশাসনের; কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত বাসিন্দাদের জন্য অযৌক্তিক শর্ত তৈরি করা হলে জনসেবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা, আবেদনকারীর কাছ থেকে চাওয়া প্রতিটি নথির উদ্দেশ্য এবং বিকল্প কাগজপত্র গ্রহণের সুযোগ সম্পর্কে পরিষ্কার নির্দেশনা প্রকাশের দাবি উঠেছে।
প্রশাসকের কাছে স্থানীয়দের সাত দফা দাবি
৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের নতুন প্রশাসক ও লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তারের কাছে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নাগরিক সেবা প্রদানের নিয়ম পুনর্বিবেচনা করা হোক। বিশেষ করে নাগরিক সনদ ও অন্যান্য সাধারণ প্রত্যয়নপত্রের ক্ষেত্রে নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়নের বাধ্যবাধকতার সুনির্দিষ্ট ভিত্তি প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের উত্থাপিত সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—
১. নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়নের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত করা।
২. সাধারণ নাগরিক সনদের আবেদনে ৯ ধরনের কাগজপত্র বাধ্যতামূলক করার যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা করা।
৩. বিদ্যুৎ সংযোগ, জমির খতিয়ান কিংবা হোল্ডিং ট্যাক্সের কাগজ না থাকা পরিবারের জন্য বিকল্প যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা।
৪. দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত খরচ ও আর্থিক অসচ্ছলতা বিবেচনায় সেবা সহজ করা।
৫. একাধিক সরকারি দপ্তরে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত ও অহেতুক হয়রানি বন্ধ করা।
৬. জাল কাগজপত্র, ভুয়া পরিচয় কিংবা অর্থের বিনিময়ে সনদ দেওয়ার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করা।
৭. নাগরিক সেবার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সরকারি ফি ও আবেদনপ্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা।
জনবান্ধব নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা
ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকেন্দ্রগুলোর একটি। জন্মনিবন্ধন, জাতীয়তা সনদ, নাগরিকত্ব প্রত্যয়ন, ভূমিহীন সনদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে মানুষকে যেন অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ করতে না হয়, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। প্রয়োজনীয় পরিচয় যাচাই ও নথিপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতেই পারে। তবে প্রতিটি শর্তের পেছনে যুক্তিসংগত প্রশাসনিক ভিত্তি থাকা এবং তা আবেদনকারীদের কাছে সহজ ভাষায় প্রকাশ করা জরুরি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া ও বিকল্প যাচাইয়ের সুযোগ রাখা হলে সেবার কার্যকারিতা বাড়বে।
ফাঁসিয়াখালীর বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁদের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। কোন সনদের জন্য ঠিক কতটি কাগজ প্রয়োজন, নির্বাচন অফিসের সত্যায়ন কেন দরকার, কোনো কাগজ না থাকলে বিকল্প কী এবং আবেদন নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগবে—এসব তথ্য ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ড ও অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন। একটি সনদ পেতে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্বাচন অফিসে বারবার ছুটতে হবে কেন—এ প্রশ্নের প্রশাসনিক ব্যাখ্যা ও বাস্তবসম্মত সমাধান চান স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
আরোও পড়ুন – লামায় অংহ্লারী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান
নাগরিক সনদ পেতে ৯ কাগজপত্র, ফাঁসিয়াখালীতে ভোগান্তির অভিযোগ
সাদ্দাম হোসেন সাইফ | বিশেষ প্রতিনিধি : (বান্দরবান)
বান্দরবানের লামা উপজেলার ৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, একটি সাধারণ সনদ পেতেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপির পাশাপাশি নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়িত করে জমা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে জন্মনিবন্ধন, জমির খতিয়ান, বিদ্যুৎ বিল, হোল্ডিং ট্যাক্সের কাগজসহ একাধিক নথি সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা থাকায় সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে ইউনিয়নের দুর্গম এলাকার নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নাগরিক সনদ পেতে ৯ ধরনের কাগজপত্রের নির্দেশনা
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত আবেদন ফরমে জাতীয়তা সনদ, প্রত্যয়নপত্র, বিশেষ প্রত্যয়ন ও ভূমিহীন সনদ সংগ্রহের জন্য আবেদনকারীদের মোট ৯ ধরনের কাগজপত্র সংযুক্ত করতে বলা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, নির্বাচন অফিস কর্তৃক সত্যায়িত এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি, জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি, ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক সত্যায়িত জন্মনিবন্ধনের ভেরিফিকেশন কপি এবং পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা মৃত্যু সনদের ফটোকপি। এ ছাড়া নিজ, পিতা-মাতা কিংবা দাদা-দাদির জমির খতিয়ান অথবা ভূমিহীন সনদ, বিদ্যুৎ বিল, হাল সনের হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের কাগজ এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি চাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
আবেদনপত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ, সংরক্ষিত মহিলা সদস্য এবং সাধারণ সদস্যের স্বাক্ষর ও সিল সংগ্রহের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সাধারণ নাগরিক সনদের জন্য এতগুলো নথি বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? যাঁদের বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নিজস্ব জমি নেই কিংবা জমির খতিয়ান সংগ্রহের সুযোগ নেই, তাঁরা কীভাবে এসব শর্ত পূরণ করবেন? বিশেষ করে অন্যের জমিতে বসবাসকারী পরিবার কিংবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে সেবা পাওয়া আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এনআইডি সত্যায়ন নিয়ে বাড়তি প্রশ্ন
স্থানীয়দের অসন্তোষের অন্যতম কারণ নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়িত করার বিষয়টি। তাঁদের ভাষ্য, জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারি ব্যবস্থা থাকার পরও আলাদা করে নির্বাচন অফিসে গিয়ে সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে ইউনিয়ন পরিষদ ও নির্বাচন অফিসের মধ্যে একাধিকবার যাতায়াত করতে হয়। দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত যাতায়াত সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে সাধারণ আবেদনকারীকে কেন একাধিক দপ্তরে যেতে হবে?
এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাইয়ের জন্য পৃথক আবেদন ফরম রয়েছে। সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও প্রবিধানমালায় উল্লেখ আছে। তবে এসব বিধান থেকে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের প্রতিটি নাগরিক সনদের আবেদনে নির্বাচন অফিসের সত্যায়িত ভেরিফিকেশন কপি বাধ্যতামূলক—এমন কোনো সর্বজনীন নির্দেশনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয় পরিষদের এই শর্তের পেছনে নির্দিষ্ট সরকারি পরিপত্র, প্রশাসনিক নির্দেশনা কিংবা স্থানীয় সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
দুর্গম এলাকায় যাতায়াতেই বাড়ছে ব্যয়
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা, বনফুর, কুমারী, ত্রিশডেবা, গয়ালমারা ও সাপেরঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে একটি সনদ সংগ্রহের জন্য কয়েক দফা যাতায়াত করতে গিয়ে তাঁদের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকার বাসিন্দাদের মোটরসাইকেল ভাড়া করে চলাচল করতে হয়। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক হাজার টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে; দূরবর্তী এলাকা থেকে একাধিক দপ্তরে যাতায়াত করলে তা দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এসব ব্যয়ের পরিমাণ এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, যাঁদের দৈনিক আয় সীমিত, তাঁদের জন্য শুধু কাগজপত্র সংগ্রহ করতেই কয়েক দিনের উপার্জন ব্যয় হয়ে যেতে পারে। কোনো পরিবারের বিদ্যুৎ বিল না থাকলে, জমির মালিকানা না থাকলে কিংবা প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে আবেদনপ্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নাগরিক সনদসহ প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিকল্প প্রমাণপত্র গ্রহণ, স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই এবং একাধিক দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
অনিয়ম প্রতিরোধ, নাকি সাধারণ মানুষের বাড়তি ভোগান্তি?
স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন, ভুয়া পরিচয়, জাল কাগজপত্র কিংবা অনিয়ম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে কোন নির্দিষ্ট অনিয়ম ঠেকাতে এই প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে, তা আবেদনকারীদের কাছে পরিষ্কার নয়। তাঁদের মতে, পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যাচাইয়ের নামে প্রকৃত নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি করা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি ভুয়া তথ্য দিয়ে সনদ সংগ্রহ করেছেন—এমন অভিযোগ থাকলে তা নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটিও যথাযথভাবে তদন্ত করা উচিত।
বিশেষ করে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, জাল নথি জমা কিংবা অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিকে সনদ দেওয়ার মতো অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, অনিয়ম বন্ধের দায়িত্ব প্রশাসনের; কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত বাসিন্দাদের জন্য অযৌক্তিক শর্ত তৈরি করা হলে জনসেবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা, আবেদনকারীর কাছ থেকে চাওয়া প্রতিটি নথির উদ্দেশ্য এবং বিকল্প কাগজপত্র গ্রহণের সুযোগ সম্পর্কে পরিষ্কার নির্দেশনা প্রকাশের দাবি উঠেছে।
প্রশাসকের কাছে স্থানীয়দের সাত দফা দাবি
৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের নতুন প্রশাসক ও লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তারের কাছে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নাগরিক সেবা প্রদানের নিয়ম পুনর্বিবেচনা করা হোক। বিশেষ করে নাগরিক সনদ ও অন্যান্য সাধারণ প্রত্যয়নপত্রের ক্ষেত্রে নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়নের বাধ্যবাধকতার সুনির্দিষ্ট ভিত্তি প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের উত্থাপিত সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—
১. নির্বাচন অফিস থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশন কপি সত্যায়নের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত করা।
২. সাধারণ নাগরিক সনদের আবেদনে ৯ ধরনের কাগজপত্র বাধ্যতামূলক করার যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা করা।
৩. বিদ্যুৎ সংযোগ, জমির খতিয়ান কিংবা হোল্ডিং ট্যাক্সের কাগজ না থাকা পরিবারের জন্য বিকল্প যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা।
৪. দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত খরচ ও আর্থিক অসচ্ছলতা বিবেচনায় সেবা সহজ করা।
৫. একাধিক সরকারি দপ্তরে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত ও অহেতুক হয়রানি বন্ধ করা।
৬. জাল কাগজপত্র, ভুয়া পরিচয় কিংবা অর্থের বিনিময়ে সনদ দেওয়ার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করা।
৭. নাগরিক সেবার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সরকারি ফি ও আবেদনপ্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা।
জনবান্ধব নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা
ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকেন্দ্রগুলোর একটি। জন্মনিবন্ধন, জাতীয়তা সনদ, নাগরিকত্ব প্রত্যয়ন, ভূমিহীন সনদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে মানুষকে যেন অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ করতে না হয়, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। প্রয়োজনীয় পরিচয় যাচাই ও নথিপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতেই পারে। তবে প্রতিটি শর্তের পেছনে যুক্তিসংগত প্রশাসনিক ভিত্তি থাকা এবং তা আবেদনকারীদের কাছে সহজ ভাষায় প্রকাশ করা জরুরি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া ও বিকল্প যাচাইয়ের সুযোগ রাখা হলে সেবার কার্যকারিতা বাড়বে।
ফাঁসিয়াখালীর বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁদের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। কোন সনদের জন্য ঠিক কতটি কাগজ প্রয়োজন, নির্বাচন অফিসের সত্যায়ন কেন দরকার, কোনো কাগজ না থাকলে বিকল্প কী এবং আবেদন নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগবে—এসব তথ্য ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ড ও অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন। একটি সনদ পেতে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্বাচন অফিসে বারবার ছুটতে হবে কেন—এ প্রশ্নের প্রশাসনিক ব্যাখ্যা ও বাস্তবসম্মত সমাধান চান স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
আরোও পড়ুন – লামায় অংহ্লারী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান