বগুড়ায় হামের আতঙ্কে ১৮ শিশুর মৃত্যু, দুই মাসে হাসপাতালে ভর্তি ৫৮৮

বগুড়া জেলা প্রতিনিধিঃ

বগুড়ায় হাম আতঙ্ক ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত দুই মাসে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে শত শত শিশু জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও চিন্তায় ফেলেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিল, যার ফলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি শিশু ভর্তি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত শনিবার সাত মাস বয়সী আয়াত নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে ২২ মে পাঁচ মাস বয়সী আবদুর রহমান এবং ২০ মে ছয় মাস বয়সী আদদান নামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ শিশুই হাসপাতালে আনার আগেই গুরুতর অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হওয়ায় তাদের জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বগুড়ায় হাম আতঙ্ক নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৬৫ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শজিমেক হাসপাতালে ৪৮ জন, ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নয়জন এবং টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতউল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালে আটজন ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৪ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৯ শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে আনলে জটিলতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫৮৮ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৫২৩ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। সন্দেহভাজন ৫২৩ শিশুর রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে ১৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ধুনট, সদর, শেরপুর, গাবতলী, শাজাহানপুর, কাহালু, সোনাতলা ও শিবগঞ্জ উপজেলার শিশুরা রয়েছে। বগুড়া পৌরসভাতেও একাধিক আক্রান্ত শিশুর সন্ধান পাওয়া গেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বগুড়ায় হাম আতঙ্ক বাড়ার অন্যতম কারণ হলো শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সময়মতো টিকা না নেওয়া। অনেক পরিবার প্রাথমিক উপসর্গকে সাধারণ জ্বর মনে করে অবহেলা করছে। ফলে পরে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আনতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ করলে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে, সন্দেহভাজন আট শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে। এর মধ্যে শেরপুরে একজন, গাবতলীতে দুজন, শাজাহানপুরে একজন, শিবগঞ্জে একজন, ধুনটে একজন এবং সদরে দুজন রয়েছে। এছাড়া শেরপুরের আট মাস বয়সী শিশু রাশমিকার শরীরে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে। বগুড়ার বাইরে অন্য জেলার আরও নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যারা বগুড়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ আলম জানিয়েছেন, জেলায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “গত দুই মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নয়জন বগুড়ার এবং বাকি নয়জন অন্যান্য জেলার বাসিন্দা।” তিনি আরও জানান, এখনো সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম থাকায় বগুড়াকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়নি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে দানা, চোখ লাল হওয়া, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে বগুড়ায় হাম আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

আরোও পড়ুন – বগুড়া সিটি বোনাস: ঈদে মাস্টাররোল কর্মীদের ৪৩ লাখ টাকার সহায়তা

বগুড়ায় হামের আতঙ্কে ১৮ শিশুর মৃত্যু, দুই মাসে হাসপাতালে ভর্তি ৫৮৮

মে ২৭, ২০২৬

বগুড়া জেলা প্রতিনিধিঃ

বগুড়ায় হাম আতঙ্ক ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত দুই মাসে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে শত শত শিশু জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও চিন্তায় ফেলেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিল, যার ফলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি শিশু ভর্তি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত শনিবার সাত মাস বয়সী আয়াত নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে ২২ মে পাঁচ মাস বয়সী আবদুর রহমান এবং ২০ মে ছয় মাস বয়সী আদদান নামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ শিশুই হাসপাতালে আনার আগেই গুরুতর অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হওয়ায় তাদের জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বগুড়ায় হাম আতঙ্ক নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৬৫ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শজিমেক হাসপাতালে ৪৮ জন, ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নয়জন এবং টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতউল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালে আটজন ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৪ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৯ শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত হাসপাতালে আনলে জটিলতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫৮৮ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৫২৩ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। সন্দেহভাজন ৫২৩ শিশুর রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে ১৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ধুনট, সদর, শেরপুর, গাবতলী, শাজাহানপুর, কাহালু, সোনাতলা ও শিবগঞ্জ উপজেলার শিশুরা রয়েছে। বগুড়া পৌরসভাতেও একাধিক আক্রান্ত শিশুর সন্ধান পাওয়া গেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বগুড়ায় হাম আতঙ্ক বাড়ার অন্যতম কারণ হলো শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সময়মতো টিকা না নেওয়া। অনেক পরিবার প্রাথমিক উপসর্গকে সাধারণ জ্বর মনে করে অবহেলা করছে। ফলে পরে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আনতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ করলে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে, সন্দেহভাজন আট শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে। এর মধ্যে শেরপুরে একজন, গাবতলীতে দুজন, শাজাহানপুরে একজন, শিবগঞ্জে একজন, ধুনটে একজন এবং সদরে দুজন রয়েছে। এছাড়া শেরপুরের আট মাস বয়সী শিশু রাশমিকার শরীরে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে। বগুড়ার বাইরে অন্য জেলার আরও নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যারা বগুড়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ আলম জানিয়েছেন, জেলায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “গত দুই মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নয়জন বগুড়ার এবং বাকি নয়জন অন্যান্য জেলার বাসিন্দা।” তিনি আরও জানান, এখনো সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম থাকায় বগুড়াকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়নি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে দানা, চোখ লাল হওয়া, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে বগুড়ায় হাম আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

আরোও পড়ুন – বগুড়া সিটি বোনাস: ঈদে মাস্টাররোল কর্মীদের ৪৩ লাখ টাকার সহায়তা