পশ্চিমাঞ্চল রেলে চাকরি বাণিজ্য: সাবেক–বর্তমান কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ভয়ংকর জাল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে নিয়োগ বাণিজ্য এখন আর গোপন কোনো ঘটনা নয়। একাধিক অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের লিখিত আবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও–ভিডিও এবং সরাসরি প্রশাসনের সামনে ওঠা প্রমাণের পরও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।


এই নিয়োগ বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলের সরঞ্জাম দপ্তরের অফিস সহকারী মোঃ সত্যব্রত ইসলাম হৃদয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।


তদন্তে উঠে এসেছে, এই সিন্ডিকেটে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের সাবেক কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন, যুবদলের নাম ব্যবহারকারী শাহীন ওরফে বালতি শাহীন এবং সাবেক কর্মকর্তা রাসেদ ইবনে আকবর। অভিযোগ অনুযায়ী, এই চারজনের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা নিয়োগ ও আউটসোর্সিং কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছে।


বিশেষ করে অভিযোগ রয়েছে, হৃদয় আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে যুবদলের ছত্রছায়ায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখছেন। তার পরিবারের একাধিক সদস্য রেলের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত থাকার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে।


ভুক্তভোগী সাব্বির হোসেন জানান, রাজশাহীতে অফিস সহকারী পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়। প্রথম দফায় নগদ দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে তাকে সৈয়দপুরে নিয়ে গিয়ে দৈনিক লেবার হিসেবে কাজে যোগ দিতে বলা হয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি চাকরি গ্রহণ না করে ফিরে আসেন এবং টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় দীর্ঘ টালবাহানা।


পরবর্তীতে তিনি বোয়ালিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার ভাগ্নে আল আমিন জানান, অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নতুন করে নিয়োগের প্রস্তাব পাঠাতে থাকেন, যা পুরো সিন্ডিকেটের বেপরোয়া আচরণকেই স্পষ্ট করে।


ঘটনার এক পর্যায়ে রাজশাহীতে কর্মরত সংবাদকর্মী ও ভুক্তভোগীরা পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপকের দপ্তরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ জানাতে গেলে, সেখানে লাউড স্পিকারে অভিযুক্তের ফোনালাপ শোনা যায়। ওই ফোনালাপ শোনার পর মহাব্যবস্থাপক তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।


রেল প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এখনো অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


এদিকে যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, শাহীন নামে পরিচিত ব্যক্তি যুবদলের কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে নেই। যদিও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, তিনি যুবদলের একটি ওয়ার্ড ইউনিটের আহ্বায়ক প্রার্থী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন।


সব মিলিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নিয়োগ বাণিজ্য এখন একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব, সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের যোগসাজশ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এখন প্রশ্ন একটাই—তদন্ত কি আদৌ বাস্তব পরিণতি পাবে, নাকি আগের মতোই সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যাবে সব অভিযোগ?

পশ্চিমাঞ্চল রেলে চাকরি বাণিজ্য: সাবেক–বর্তমান কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ভয়ংকর জাল

জানুয়ারি ৫, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে নিয়োগ বাণিজ্য এখন আর গোপন কোনো ঘটনা নয়। একাধিক অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের লিখিত আবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও–ভিডিও এবং সরাসরি প্রশাসনের সামনে ওঠা প্রমাণের পরও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।


এই নিয়োগ বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলের সরঞ্জাম দপ্তরের অফিস সহকারী মোঃ সত্যব্রত ইসলাম হৃদয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।


তদন্তে উঠে এসেছে, এই সিন্ডিকেটে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের সাবেক কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন, যুবদলের নাম ব্যবহারকারী শাহীন ওরফে বালতি শাহীন এবং সাবেক কর্মকর্তা রাসেদ ইবনে আকবর। অভিযোগ অনুযায়ী, এই চারজনের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা নিয়োগ ও আউটসোর্সিং কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছে।


বিশেষ করে অভিযোগ রয়েছে, হৃদয় আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে যুবদলের ছত্রছায়ায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখছেন। তার পরিবারের একাধিক সদস্য রেলের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত থাকার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে।


ভুক্তভোগী সাব্বির হোসেন জানান, রাজশাহীতে অফিস সহকারী পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়। প্রথম দফায় নগদ দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে তাকে সৈয়দপুরে নিয়ে গিয়ে দৈনিক লেবার হিসেবে কাজে যোগ দিতে বলা হয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি চাকরি গ্রহণ না করে ফিরে আসেন এবং টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় দীর্ঘ টালবাহানা।


পরবর্তীতে তিনি বোয়ালিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার ভাগ্নে আল আমিন জানান, অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নতুন করে নিয়োগের প্রস্তাব পাঠাতে থাকেন, যা পুরো সিন্ডিকেটের বেপরোয়া আচরণকেই স্পষ্ট করে।


ঘটনার এক পর্যায়ে রাজশাহীতে কর্মরত সংবাদকর্মী ও ভুক্তভোগীরা পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপকের দপ্তরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ জানাতে গেলে, সেখানে লাউড স্পিকারে অভিযুক্তের ফোনালাপ শোনা যায়। ওই ফোনালাপ শোনার পর মহাব্যবস্থাপক তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।


রেল প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এখনো অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


এদিকে যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, শাহীন নামে পরিচিত ব্যক্তি যুবদলের কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে নেই। যদিও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, তিনি যুবদলের একটি ওয়ার্ড ইউনিটের আহ্বায়ক প্রার্থী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন।


সব মিলিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নিয়োগ বাণিজ্য এখন একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব, সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের যোগসাজশ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এখন প্রশ্ন একটাই—তদন্ত কি আদৌ বাস্তব পরিণতি পাবে, নাকি আগের মতোই সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যাবে সব অভিযোগ?