তেলের নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের কৌশল, চীনকে চাপে ফেলতে বাড়ছে বৈশ্বিক উত্তেজনা

আন্তর্জাতিক ​নিউজ ডেস্ক | ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

তেলের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে চীনকে চাপে ফেলতে চাইছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির ভারসাম্য নির্ধারণে তেলের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ভেনেজুয়েলা, হরমুজ প্রণালী এবং মালাক্কা প্রণালী—এই তিনটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এবং মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলগুলো বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্লেষকদের মতে, এসব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত তেলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

২০২৬ সালের শুরু থেকেই এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন স্পষ্ট হতে থাকে। প্রথম ধাপে ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তেলের উৎসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। এরপর হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা তৈরি করে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা হয়। সর্বশেষ ধাপে মালাক্কা প্রণালীতে নজরদারি বাড়িয়ে চীনের আমদানি নির্ভর জ্বালানি প্রবাহকে চাপে ফেলা হয়। ধারাবাহিক এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে তেলের নিয়ন্ত্রণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অন্যদিকে চীন এই চাপ মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পাকিস্তানের মাধ্যমে স্থলপথে তেল পরিবহনের অবকাঠামো জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তেল মজুদ এবং ট্র্যাকিং এড়ানো ট্যাঙ্কার ব্যবহার করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের নিয়ন্ত্রণ কৌশল পুরোপুরি সফল হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বাজারে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার ফলে বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে স্পষ্ট যে, তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই প্রতিযোগিতা এখন বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এদিকে ভারত এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান মালাক্কা প্রণালীর ওপর প্রাকৃতিক নজরদারির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি কৌশলগত ধৈর্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, আর চীন বিকল্প অবকাঠামো ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সেই চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতায় কার প্রভাব বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নির্ভর করছে বৈশ্বিক তেলের নিয়ন্ত্রণ কতটা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে তার ওপর।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ( NDTV ) বিশ্লেষণ অবলম্বনে

আরোও পড়ুন – মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ৬ সপ্তাহ: ইরান ও লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়াল

তেলের নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের কৌশল, চীনকে চাপে ফেলতে বাড়ছে বৈশ্বিক উত্তেজনা

এপ্রিল ১৫, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ​নিউজ ডেস্ক | ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

তেলের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে চীনকে চাপে ফেলতে চাইছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির ভারসাম্য নির্ধারণে তেলের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ভেনেজুয়েলা, হরমুজ প্রণালী এবং মালাক্কা প্রণালী—এই তিনটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এবং মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলগুলো বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্লেষকদের মতে, এসব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত তেলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

২০২৬ সালের শুরু থেকেই এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন স্পষ্ট হতে থাকে। প্রথম ধাপে ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তেলের উৎসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। এরপর হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা তৈরি করে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা হয়। সর্বশেষ ধাপে মালাক্কা প্রণালীতে নজরদারি বাড়িয়ে চীনের আমদানি নির্ভর জ্বালানি প্রবাহকে চাপে ফেলা হয়। ধারাবাহিক এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে তেলের নিয়ন্ত্রণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অন্যদিকে চীন এই চাপ মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পাকিস্তানের মাধ্যমে স্থলপথে তেল পরিবহনের অবকাঠামো জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তেল মজুদ এবং ট্র্যাকিং এড়ানো ট্যাঙ্কার ব্যবহার করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের নিয়ন্ত্রণ কৌশল পুরোপুরি সফল হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বাজারে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার ফলে বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে স্পষ্ট যে, তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই প্রতিযোগিতা এখন বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এদিকে ভারত এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান মালাক্কা প্রণালীর ওপর প্রাকৃতিক নজরদারির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এই অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি কৌশলগত ধৈর্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, আর চীন বিকল্প অবকাঠামো ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সেই চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতায় কার প্রভাব বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নির্ভর করছে বৈশ্বিক তেলের নিয়ন্ত্রণ কতটা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে তার ওপর।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ( NDTV ) বিশ্লেষণ অবলম্বনে

আরোও পড়ুন – মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ৬ সপ্তাহ: ইরান ও লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়াল