অপরিকল্পিত উন্নয়নে হুমকিতে হাজিরহাট, নদীভাঙনে জলে গেল ৩০ লাখ টাকা

মো. আতিকুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাজিরহাট এলাকা ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়েছে। তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোত আর অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুততার সঙ্গে নদীপাড়ে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ পরিকল্পনা, কারিগরি জরিপ এবং স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া দায়সারা প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সরকারের প্রায় ৩০ লাখ টাকা কার্যত নদীতে ভেসে গেছে। বর্তমানে “হাজিরহাট ভাঙন” পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, বাজার, মসজিদ ও বহু বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাজিরহাট জামে মসজিদ এবং সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজার এলাকাকে রক্ষার জন্য সম্প্রতি জরুরি ভিত্তিতে একটি আপদকালীন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় নদীর তীর সংরক্ষণে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা শুরু হয়। কিন্তু ভাঙনের মূল কেন্দ্র, নদীর গভীরতা, পানির স্রোতের দিক এবং তলদেশের গঠন বিশ্লেষণ না করেই কাজ করায় পুরো উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এলাকাবাসী জানান, যেসব স্থানে ভাঙনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেসব জায়গা উপেক্ষা করে এলোমেলোভাবে বস্তা ফেলায় পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং “হাজিরহাট ভাঙন” রোধে নেওয়া এই প্রকল্প স্থানীয়দের কাছে এখন লোক দেখানো উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীতে ফেলা জিও ব্যাগের বেশিরভাগই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্রোতের টানে তলিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নদীর তীর ধসে পড়ে মসজিদের খুব কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। স্থানীয় মুসল্লিরা বলছেন, প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। মসজিদের পাশের মাটি ধসে পড়ার দৃশ্য দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় পুরো স্থাপনাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজারের কয়েকটি দোকানও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও স্থায়ী কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় এখন “হাজিরহাট ভাঙন” পুরো জনপদের অস্তিত্ব সংকটে পরিণত হয়েছে।

হাজিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অভিযোগ করেন, নদী যখন বাজারের একেবারে সীমানায় এসে পৌঁছেছে, তখন নামমাত্র কিছু বালুর বস্তা ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র রক্ষায় শুধু জিও ব্যাগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই গাইড ওয়াল এবং সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যদি বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হতো এবং সঠিক নকশা অনুযায়ী কাজ করা হতো, তাহলে সরকারের অর্থ অপচয় হতো না। তাদের মতে, “হাজিরহাট ভাঙন” এখন শুধু পরিবেশগত দুর্যোগ নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এলাকাবাসী আরও জানান, হাজিরহাট এই অঞ্চলের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। প্রতিদিন আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে শত শত মানুষ এখানে কেনাবেচা করতে আসেন। বাজারটি নদীগর্ভে বিলীন হলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া বাজারসংলগ্ন বহু পরিবার ইতোমধ্যে তাদের বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। নদীভাঙনের কারণে অনেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাংশও স্বীকার করেছেন যে, দ্রুত স্থায়ী পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ভুক্তভোগী বাসিন্দারা অবিলম্বে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মো. নুরুল হক নুর, এমপি এবং দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শুধু অস্থায়ী প্রকল্প দিয়ে আর সময়ক্ষেপণ করলে হাজিরহাটের অস্তিত্বই একসময় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। তাই দ্রুত কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আরোও পড়ুন – কলাপাড়ায় প্রবাসী গৃহবধূ হত্যা: টাকার জন্য স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

অপরিকল্পিত উন্নয়নে হুমকিতে হাজিরহাট, নদীভাঙনে জলে গেল ৩০ লাখ টাকা

মে ১৯, ২০২৬

মো. আতিকুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাজিরহাট এলাকা ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়েছে। তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোত আর অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুততার সঙ্গে নদীপাড়ে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ পরিকল্পনা, কারিগরি জরিপ এবং স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া দায়সারা প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সরকারের প্রায় ৩০ লাখ টাকা কার্যত নদীতে ভেসে গেছে। বর্তমানে “হাজিরহাট ভাঙন” পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, বাজার, মসজিদ ও বহু বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাজিরহাট জামে মসজিদ এবং সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজার এলাকাকে রক্ষার জন্য সম্প্রতি জরুরি ভিত্তিতে একটি আপদকালীন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় নদীর তীর সংরক্ষণে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা শুরু হয়। কিন্তু ভাঙনের মূল কেন্দ্র, নদীর গভীরতা, পানির স্রোতের দিক এবং তলদেশের গঠন বিশ্লেষণ না করেই কাজ করায় পুরো উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এলাকাবাসী জানান, যেসব স্থানে ভাঙনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেসব জায়গা উপেক্ষা করে এলোমেলোভাবে বস্তা ফেলায় পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং “হাজিরহাট ভাঙন” রোধে নেওয়া এই প্রকল্প স্থানীয়দের কাছে এখন লোক দেখানো উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীতে ফেলা জিও ব্যাগের বেশিরভাগই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্রোতের টানে তলিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নদীর তীর ধসে পড়ে মসজিদের খুব কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। স্থানীয় মুসল্লিরা বলছেন, প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। মসজিদের পাশের মাটি ধসে পড়ার দৃশ্য দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় পুরো স্থাপনাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজারের কয়েকটি দোকানও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও স্থায়ী কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় এখন “হাজিরহাট ভাঙন” পুরো জনপদের অস্তিত্ব সংকটে পরিণত হয়েছে।

হাজিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অভিযোগ করেন, নদী যখন বাজারের একেবারে সীমানায় এসে পৌঁছেছে, তখন নামমাত্র কিছু বালুর বস্তা ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র রক্ষায় শুধু জিও ব্যাগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই গাইড ওয়াল এবং সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যদি বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হতো এবং সঠিক নকশা অনুযায়ী কাজ করা হতো, তাহলে সরকারের অর্থ অপচয় হতো না। তাদের মতে, “হাজিরহাট ভাঙন” এখন শুধু পরিবেশগত দুর্যোগ নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এলাকাবাসী আরও জানান, হাজিরহাট এই অঞ্চলের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। প্রতিদিন আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে শত শত মানুষ এখানে কেনাবেচা করতে আসেন। বাজারটি নদীগর্ভে বিলীন হলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া বাজারসংলগ্ন বহু পরিবার ইতোমধ্যে তাদের বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। নদীভাঙনের কারণে অনেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাংশও স্বীকার করেছেন যে, দ্রুত স্থায়ী পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ভুক্তভোগী বাসিন্দারা অবিলম্বে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মো. নুরুল হক নুর, এমপি এবং দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শুধু অস্থায়ী প্রকল্প দিয়ে আর সময়ক্ষেপণ করলে হাজিরহাটের অস্তিত্বই একসময় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। তাই দ্রুত কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আরোও পড়ুন – কলাপাড়ায় প্রবাসী গৃহবধূ হত্যা: টাকার জন্য স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ