এসএম ফারহান লাবিব (জেলা প্রতিনিধি, বগুড়া)
বগুড়ার শেরপুরে রাজমিস্ত্রি শরিফ শেখকে অপহরণের অভিযোগে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে প্রাচীন কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি এবং কথিত ১০০ কোটি টাকার লেনদেনের রহস্য। একদিকে অপহরণের অভিযোগ, অন্যদিকে মূর্তি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের দাবি—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। মামলার এজাহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং শরিফের একটি ভিডিও বক্তব্যে উঠে এসেছে পরস্পরবিরোধী তথ্য। তবে কথিত মূর্তি বিক্রি ও শতকোটি টাকার লেনদেনের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর শরিফ শেখের স্ত্রী সাদিয়া খাতুন শেরপুর থানায় অপহরণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও সাত থেকে আটজনকে আসামি করা হয়। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে শরিফকে হাঁপুনিয়া বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। স্বামীর খোঁজ না পেয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সাদিয়া। পরে স্থানীয় মোটর শ্রমিক নেতা রেজাউল কবির ওরফে কবির নেতার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপহরণের অভিযোগ সামনে আসে।
এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার রাতে শরিফ ও কবির হাঁপুনিয়া বাজারে গেলে নাহিদ নামের এক ব্যক্তির দোকানের সামনে থেকে একদল ব্যক্তি তাঁদের চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়। পরে কবিরকে ছেড়ে দেওয়া হলেও শরিফকে আটকে রাখা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় শেরপুর পৌরসভার টাউন কলোনি এলাকার রাসেল বাবু হিমু, মো. রাকিব, মিঠু হোসেন ও মো. মাসুদসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়। ওই দিন রাতেই অভিযান চালিয়ে পৌর শহরের মহাসড়কের পাশে মজিবর রহমান বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে থেকে শরিফকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় এজাহারভুক্ত আসামি মিঠু হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শেরপুরে অপহরণ মামলা ঘিরে নতুন প্রশ্ন
ঘটনার পেছনের বিরোধ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শরিফ ও মাসুদের বক্তব্যসংবলিত একটি ভিডিও সামনে আসে। সেখানে প্রায় ৫৫ কেজি ওজনের একটি প্রাচীন কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি এবং সেটি বিক্রির জন্য ১০০ কোটি টাকা দর নির্ধারণের দাবি করা হয়। ভিডিও বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বগুড়া জেলা কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় শরিফের সঙ্গে শাজাহানপুর উপজেলার খাদাশ রাজবাড়ি গ্রামের অনিল চন্দ্রের পরিচয় হয়। অনিলের কাছে বড় আকারের একটি বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে বলে তিনি শরিফকে জানিয়েছিলেন—এমন দাবি করা হয়েছে। তবে মূর্তিটির অস্তিত্ব, মালিকানা কিংবা কথিত দরদামের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, জামিনে মুক্ত হওয়ার পর শরিফ অনিলের বাড়ি থেকে মূর্তিটি নিয়ে নিজের কাছে রাখেন এবং পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে দাবি করা হয়। এরপর দূরপাল্লার গাড়িচালক মাসুদ রানার সঙ্গে শরিফের যোগাযোগ হয়। তাঁরা মূর্তিটির একটি নমুনা নিয়ে ঢাকায় কথিত ক্রেতাদের সঙ্গে দেখা করেন বলে বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে। নমুনাটি রাসায়নিক পরীক্ষায় মানসম্মত প্রমাণিত হওয়ার পর মূর্তিটির দাম ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে ওই পরীক্ষা, ক্রেতাদের পরিচয়, মূল্য নির্ধারণ কিংবা কোনো বিক্রয়চুক্তির স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের মধ্যে নেই।
শরিফের বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, মাসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নেওয়ার পর তিনি মূর্তিসহ সরে যান। পরে বগুড়া শহরের খান্দার এলাকার বুলবুল হাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মূর্তি বিক্রির পরিকল্পনা করেন। বুলবুল তাঁর মামা বলে পরিচয় দেন শরিফ। তাঁকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পেরে শরিফ বিষয়টি শেরপুরের হামছায়াপুর এলাকার মোটর শ্রমিক নেতা রেজাউল কবিরকেও জানান বলে ভিডিওতে দাবি করা হয়। শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে কবির ও বুলবুল হাজী যৌথভাবে মূর্তিটি তাঁর কাছ থেকে নিজেদের হেফাজতে নেন। প্রায় এক বছর পর মূর্তিটি বিক্রি হয়েছে বলে জানতে পারলেও কথিত বিক্রির অর্থের কোনো অংশ পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শরিফ আরও দাবি করেন, অর্থের জন্য চাপ দিলে তাঁকে কয়েক দফায় কয়েক লাখ টাকা দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ফরিদপুরে চলে যাওয়ার কথাও জানান তিনি। পরে বিষয়টি প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিলে বুলবুল হাজী তাঁকে কিছু টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ইটভাটার পাশে দুই বিঘা জমি লিখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বলে শরিফের দাবি। ২০২৩ সালে শেরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মাসুদ রানার সঙ্গে তাঁর আবার দেখা হয়। মাসুদ আগের ধার দেওয়া ১০ হাজার টাকা এবং কথিত মূর্তি বিক্রির অর্থের অংশ দাবি করলে তাঁদের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা হয়। শরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, কবির সেখানে এসে মাসুদকে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।
গত ২৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনা সম্পর্কে শরিফের ভিডিও বক্তব্যে বলা হয়, জরুরি কাজের কথা বলে কবির তাঁকে মোটরসাইকেলে করে হাঁপুনিয়ায় শ্বশুরবাড়ির সামনে থেকে নিয়ে যান। পরে তাঁকে হিমু, মাসুদ ও মিঠুসহ মামলার আসামিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। উদ্ধার হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন বলেও দাবি করেন শরিফ। মূর্তি বিক্রির অর্থ নিয়ে বিরোধ মেটাতে কয়েক দফা বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। তবে অপহরণের ঘটনা, আটকে রাখা এবং নির্যাতনের অভিযোগের প্রতিটি দিক তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। মামলার অভিযোগ ও ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে থাকা অসংগতিগুলোও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মূর্তির উৎস সম্পর্কে খোঁজ নিতে শাজাহানপুর উপজেলার খাদাশ রাজবাড়ি এলাকায় যোগাযোগ করা হয়। সেখানে অনিল সরকারের ছেলে প্রসেনজিৎ জানান, তাঁর বাবা প্রায় আট বছর আগে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং প্রায় তিন বছর আগে মারা গেছেন। তবে কোনো বিষ্ণুমূর্তির বিষয়ে তাঁদের পরিবারের কেউ জানেন না বলে দাবি করেন তিনি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় পুকুর খননের সময় প্রায় ১০ বছর আগে একটি ছোট মূর্তি এবং তিন বছর আগে আনুমানিক ৬০ কেজি ওজনের একটি কালো পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। পরে পুলিশ সেটি নিয়ে যায় বলে তাঁরা জানান। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে শরিফের বক্তব্যে উঠে আসা মূর্তিটির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বগুড়ার খান্দার এলাকার বুলবুল হাজী দাবি করেন, শেরপুরের শরিফ বা কবির নামের কাউকে তিনি চেনেন না এবং তাঁকে জড়িয়ে ছড়ানো তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। অন্যদিকে, রেজাউল কবির ২০২৩ সালের বাসস্ট্যান্ডের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও মূর্তির কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, শরিফ ও মাসুদ কথিত মূর্তির অর্থের জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন। এ নিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর একটি সালিসি বৈঠক হয় এবং ২৫ সেপ্টেম্বর আবার বসার কথা ছিল। কবিরের ভাষ্য, সে কারণেই তিনি শরিফকে বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলেন; পরে মাসুদ ও হিমুরা তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন করেন। এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব দাবি, যার সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সবশেষে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দীন জানান, তাঁরাও লোকমুখে কথিত ১০০ কোটি টাকার মূর্তির কথা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। বর্তমানে শরিফ শেখকে অপহরণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে, শেরপুরে অপহরণ মামলা এখন প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি, কথিত শতকোটি টাকার লেনদেন এবং অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে আলোচনায় এসেছে। তবে মূর্তির মালিকানা, কথিত বিক্রি, অর্থের লেনদেন এবং অপহরণের পেছনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
আরোও পড়ুন – হাইমচরে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান, ৬ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ১
শেরপুরে অপহরণ মামলা ঘিরে শতকোটি টাকার মূর্তি রহস্য
এসএম ফারহান লাবিব (জেলা প্রতিনিধি, বগুড়া)
বগুড়ার শেরপুরে রাজমিস্ত্রি শরিফ শেখকে অপহরণের অভিযোগে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে প্রাচীন কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি এবং কথিত ১০০ কোটি টাকার লেনদেনের রহস্য। একদিকে অপহরণের অভিযোগ, অন্যদিকে মূর্তি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের দাবি—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। মামলার এজাহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং শরিফের একটি ভিডিও বক্তব্যে উঠে এসেছে পরস্পরবিরোধী তথ্য। তবে কথিত মূর্তি বিক্রি ও শতকোটি টাকার লেনদেনের বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর শরিফ শেখের স্ত্রী সাদিয়া খাতুন শেরপুর থানায় অপহরণের অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও সাত থেকে আটজনকে আসামি করা হয়। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে শরিফকে হাঁপুনিয়া বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। স্বামীর খোঁজ না পেয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সাদিয়া। পরে স্থানীয় মোটর শ্রমিক নেতা রেজাউল কবির ওরফে কবির নেতার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপহরণের অভিযোগ সামনে আসে।
এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার রাতে শরিফ ও কবির হাঁপুনিয়া বাজারে গেলে নাহিদ নামের এক ব্যক্তির দোকানের সামনে থেকে একদল ব্যক্তি তাঁদের চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়। পরে কবিরকে ছেড়ে দেওয়া হলেও শরিফকে আটকে রাখা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় শেরপুর পৌরসভার টাউন কলোনি এলাকার রাসেল বাবু হিমু, মো. রাকিব, মিঠু হোসেন ও মো. মাসুদসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়। ওই দিন রাতেই অভিযান চালিয়ে পৌর শহরের মহাসড়কের পাশে মজিবর রহমান বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে থেকে শরিফকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় এজাহারভুক্ত আসামি মিঠু হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শেরপুরে অপহরণ মামলা ঘিরে নতুন প্রশ্ন
ঘটনার পেছনের বিরোধ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শরিফ ও মাসুদের বক্তব্যসংবলিত একটি ভিডিও সামনে আসে। সেখানে প্রায় ৫৫ কেজি ওজনের একটি প্রাচীন কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি এবং সেটি বিক্রির জন্য ১০০ কোটি টাকা দর নির্ধারণের দাবি করা হয়। ভিডিও বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বগুড়া জেলা কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় শরিফের সঙ্গে শাজাহানপুর উপজেলার খাদাশ রাজবাড়ি গ্রামের অনিল চন্দ্রের পরিচয় হয়। অনিলের কাছে বড় আকারের একটি বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে বলে তিনি শরিফকে জানিয়েছিলেন—এমন দাবি করা হয়েছে। তবে মূর্তিটির অস্তিত্ব, মালিকানা কিংবা কথিত দরদামের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, জামিনে মুক্ত হওয়ার পর শরিফ অনিলের বাড়ি থেকে মূর্তিটি নিয়ে নিজের কাছে রাখেন এবং পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে দাবি করা হয়। এরপর দূরপাল্লার গাড়িচালক মাসুদ রানার সঙ্গে শরিফের যোগাযোগ হয়। তাঁরা মূর্তিটির একটি নমুনা নিয়ে ঢাকায় কথিত ক্রেতাদের সঙ্গে দেখা করেন বলে বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে। নমুনাটি রাসায়নিক পরীক্ষায় মানসম্মত প্রমাণিত হওয়ার পর মূর্তিটির দাম ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে ওই পরীক্ষা, ক্রেতাদের পরিচয়, মূল্য নির্ধারণ কিংবা কোনো বিক্রয়চুক্তির স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের মধ্যে নেই।
শরিফের বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, মাসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নেওয়ার পর তিনি মূর্তিসহ সরে যান। পরে বগুড়া শহরের খান্দার এলাকার বুলবুল হাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মূর্তি বিক্রির পরিকল্পনা করেন। বুলবুল তাঁর মামা বলে পরিচয় দেন শরিফ। তাঁকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পেরে শরিফ বিষয়টি শেরপুরের হামছায়াপুর এলাকার মোটর শ্রমিক নেতা রেজাউল কবিরকেও জানান বলে ভিডিওতে দাবি করা হয়। শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে কবির ও বুলবুল হাজী যৌথভাবে মূর্তিটি তাঁর কাছ থেকে নিজেদের হেফাজতে নেন। প্রায় এক বছর পর মূর্তিটি বিক্রি হয়েছে বলে জানতে পারলেও কথিত বিক্রির অর্থের কোনো অংশ পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শরিফ আরও দাবি করেন, অর্থের জন্য চাপ দিলে তাঁকে কয়েক দফায় কয়েক লাখ টাকা দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ফরিদপুরে চলে যাওয়ার কথাও জানান তিনি। পরে বিষয়টি প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিলে বুলবুল হাজী তাঁকে কিছু টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ইটভাটার পাশে দুই বিঘা জমি লিখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বলে শরিফের দাবি। ২০২৩ সালে শেরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মাসুদ রানার সঙ্গে তাঁর আবার দেখা হয়। মাসুদ আগের ধার দেওয়া ১০ হাজার টাকা এবং কথিত মূর্তি বিক্রির অর্থের অংশ দাবি করলে তাঁদের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা হয়। শরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, কবির সেখানে এসে মাসুদকে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।
গত ২৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনা সম্পর্কে শরিফের ভিডিও বক্তব্যে বলা হয়, জরুরি কাজের কথা বলে কবির তাঁকে মোটরসাইকেলে করে হাঁপুনিয়ায় শ্বশুরবাড়ির সামনে থেকে নিয়ে যান। পরে তাঁকে হিমু, মাসুদ ও মিঠুসহ মামলার আসামিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। উদ্ধার হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন বলেও দাবি করেন শরিফ। মূর্তি বিক্রির অর্থ নিয়ে বিরোধ মেটাতে কয়েক দফা বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। তবে অপহরণের ঘটনা, আটকে রাখা এবং নির্যাতনের অভিযোগের প্রতিটি দিক তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। মামলার অভিযোগ ও ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে থাকা অসংগতিগুলোও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মূর্তির উৎস সম্পর্কে খোঁজ নিতে শাজাহানপুর উপজেলার খাদাশ রাজবাড়ি এলাকায় যোগাযোগ করা হয়। সেখানে অনিল সরকারের ছেলে প্রসেনজিৎ জানান, তাঁর বাবা প্রায় আট বছর আগে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং প্রায় তিন বছর আগে মারা গেছেন। তবে কোনো বিষ্ণুমূর্তির বিষয়ে তাঁদের পরিবারের কেউ জানেন না বলে দাবি করেন তিনি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় পুকুর খননের সময় প্রায় ১০ বছর আগে একটি ছোট মূর্তি এবং তিন বছর আগে আনুমানিক ৬০ কেজি ওজনের একটি কালো পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। পরে পুলিশ সেটি নিয়ে যায় বলে তাঁরা জানান। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে শরিফের বক্তব্যে উঠে আসা মূর্তিটির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বগুড়ার খান্দার এলাকার বুলবুল হাজী দাবি করেন, শেরপুরের শরিফ বা কবির নামের কাউকে তিনি চেনেন না এবং তাঁকে জড়িয়ে ছড়ানো তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। অন্যদিকে, রেজাউল কবির ২০২৩ সালের বাসস্ট্যান্ডের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও মূর্তির কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, শরিফ ও মাসুদ কথিত মূর্তির অর্থের জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন। এ নিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর একটি সালিসি বৈঠক হয় এবং ২৫ সেপ্টেম্বর আবার বসার কথা ছিল। কবিরের ভাষ্য, সে কারণেই তিনি শরিফকে বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলেন; পরে মাসুদ ও হিমুরা তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন করেন। এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব দাবি, যার সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সবশেষে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দীন জানান, তাঁরাও লোকমুখে কথিত ১০০ কোটি টাকার মূর্তির কথা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। বর্তমানে শরিফ শেখকে অপহরণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে, শেরপুরে অপহরণ মামলা এখন প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি, কথিত শতকোটি টাকার লেনদেন এবং অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে আলোচনায় এসেছে। তবে মূর্তির মালিকানা, কথিত বিক্রি, অর্থের লেনদেন এবং অপহরণের পেছনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
আরোও পড়ুন – হাইমচরে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান, ৬ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ১