কানাইঘাটে জিরা চোরাচালান: নোহা গাড়িসহ আটক ১, থামছে না সীমান্ত অপরাধ

মিজানুর রহমান (লাভলু), সিলেটঃ

সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে চোরাকারবারী চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে জিরা চোরাচালান নতুন করে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান সত্ত্বেও এই অবৈধ বাণিজ্য কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সংঘবদ্ধ একটি শক্তিশালী চক্র প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় জিরা, চা পাতা ও বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী দেশে প্রবেশ করাচ্ছে এবং তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে কানাইঘাট থানা পুলিশ একটি বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় একটি নোহা গাড়িতে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা বহন করার সময় গাড়িসহ চালককে আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, আটক গাড়িতে প্রায় ২৫ বস্তা জিরা পাওয়া গেছে, যা অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে আনা হয়েছিল। এ ঘটনায় জিরা চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তা আবারও সামনে আসে এবং স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

আটক ব্যক্তির নাম আব্দুর রফিক (৩০), তিনি জৈন্তাপুর উপজেলার হেমু মাঝপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সোনা মিয়ার ছেলে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তের মাধ্যমে এই জিরা চোরাচালান নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

কানাইঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে সম্প্রতি চোরাচালানবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পৌরসভার নন্দিরাই বাইপাস পয়েন্টে সার্বক্ষণিক চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যাতে করে অবৈধ পণ্য পরিবহন বন্ধ করা যায়। তবে বাস্তবতা হলো, চোরাকারবারীরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবিও তাদের অভিযান বাড়িয়েছে। মাত্র দুদিন আগে পৌরসভার বায়মপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২২৬ বস্তা ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এতে বোঝা যাচ্ছে, সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক আকারে জিরা চোরাচালান চলছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে।

স্থানীয়রা বলছেন, অতীতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়কালে যারা এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামে গুদাম তৈরি করে এসব পণ্য মজুদ করছে এবং পরে ট্রাক, কাভার ভ্যান, পিকআপ, নোহা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে। এতে করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং জনগণের সচেতনতা। কারণ, এই জিরা চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং দেশের বৈধ বাজার ব্যবস্থাকেও ব্যাহত করছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারীরা। রাতের আঁধারে কিংবা ভোরবেলায় এসব পণ্য সহজেই পার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি তাদের সহায়তা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার নয়, সামাজিক সমস্যাতেও রূপ নিচ্ছে।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চোরাচালান বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। ইতোমধ্যে আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, খুব শিগগিরই এই জিরা চোরাচালান চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

আরোও পড়ুন – মহেশপুর সীমান্তে মাদকসহ বাংলাদেশি ৩ যুবককে বিএসএফের আটক

কানাইঘাটে জিরা চোরাচালান: নোহা গাড়িসহ আটক ১, থামছে না সীমান্ত অপরাধ

এপ্রিল ২৩, ২০২৬

মিজানুর রহমান (লাভলু), সিলেটঃ

সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে চোরাকারবারী চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে জিরা চোরাচালান নতুন করে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান সত্ত্বেও এই অবৈধ বাণিজ্য কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সংঘবদ্ধ একটি শক্তিশালী চক্র প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় জিরা, চা পাতা ও বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী দেশে প্রবেশ করাচ্ছে এবং তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে কানাইঘাট থানা পুলিশ একটি বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় একটি নোহা গাড়িতে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা বহন করার সময় গাড়িসহ চালককে আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, আটক গাড়িতে প্রায় ২৫ বস্তা জিরা পাওয়া গেছে, যা অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে আনা হয়েছিল। এ ঘটনায় জিরা চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তা আবারও সামনে আসে এবং স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

আটক ব্যক্তির নাম আব্দুর রফিক (৩০), তিনি জৈন্তাপুর উপজেলার হেমু মাঝপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সোনা মিয়ার ছেলে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তের মাধ্যমে এই জিরা চোরাচালান নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

কানাইঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে সম্প্রতি চোরাচালানবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পৌরসভার নন্দিরাই বাইপাস পয়েন্টে সার্বক্ষণিক চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যাতে করে অবৈধ পণ্য পরিবহন বন্ধ করা যায়। তবে বাস্তবতা হলো, চোরাকারবারীরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবিও তাদের অভিযান বাড়িয়েছে। মাত্র দুদিন আগে পৌরসভার বায়মপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২২৬ বস্তা ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এতে বোঝা যাচ্ছে, সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক আকারে জিরা চোরাচালান চলছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে।

স্থানীয়রা বলছেন, অতীতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়কালে যারা এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামে গুদাম তৈরি করে এসব পণ্য মজুদ করছে এবং পরে ট্রাক, কাভার ভ্যান, পিকআপ, নোহা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে। এতে করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং জনগণের সচেতনতা। কারণ, এই জিরা চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং দেশের বৈধ বাজার ব্যবস্থাকেও ব্যাহত করছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারীরা। রাতের আঁধারে কিংবা ভোরবেলায় এসব পণ্য সহজেই পার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি তাদের সহায়তা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার নয়, সামাজিক সমস্যাতেও রূপ নিচ্ছে।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চোরাচালান বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। ইতোমধ্যে আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, খুব শিগগিরই এই জিরা চোরাচালান চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

আরোও পড়ুন – মহেশপুর সীমান্তে মাদকসহ বাংলাদেশি ৩ যুবককে বিএসএফের আটক