মাজহারুল ইসলাম বাদলঃ
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের একত্রে মেধা যাচাই পরীক্ষার উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দেশের বৃহৎ একটি অংশের শিশু শিক্ষাজীবন শুরু করে। এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশ আসে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবার থেকে। তাদের পড়াশোনা নির্ভর করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরবরাহকৃত পাঠ্যবই ও বিদ্যালয়ের সীমিত সুযোগ-সুবিধার ওপর। অধিকাংশ অভিভাবকের পক্ষে গাইড বই, কোচিং কিংবা অতিরিক্ত শিক্ষাসামগ্রী কেনা সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রটি অনেকাংশেই নির্ভর করে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পাঠ্যসূচির ওপর।
অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই ইংরেজি মাধ্যম, অতিরিক্ত কোচিং, সহায়ক বই এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পাঠ্যচাপও লক্ষ্য করা যায়। ফলে একই বয়সী হলেও দুই ধারার শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, প্রস্তুতি ও আত্মবিশ্বাসে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়।
এই দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের শিক্ষার্থীদের এক কাতারে এনে মেধা যাচাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো কতটা যুক্তিসংগত—তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ। তাদের মতে, এটি প্রতিযোগিতার নামে একটি অসম লড়াই, যেখানে শুরু থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে।
বিতর্কের মধ্যেই কিন্ডারগার্টেন সংশ্লিষ্টদের করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে আদালত বন্ধ থাকা অবস্থায় প্রাথমিক মেধা যাচাই পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ আসে। কিন্তু এর পর দীর্ঘ সময় পার হলেও পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এতে করে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেক শিক্ষার্থী প্রস্তুতি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে—পরীক্ষা হবে কি হবে না, হলে কোন নিয়মে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকায় তারা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন অস্থিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। তারা এটিকে এক ধরনের শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষা দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, যেখানে সুবিধাভোগী শ্রেণি আরও এগিয়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ে। এতে করে সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এবং এটিকে কখনোই বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অংশ করা উচিত নয়। শিশুদের শেখার পরিবেশ, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সময়োপযোগী ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় নীতিনির্ধারকদের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই প্রয়োজন একটি সমন্বিত, মানবিক ও বৈষম্যহীন নীতি, যেখানে প্রতিটি শিশুর শেখার অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত হবে।
কিছু মহল আরও কঠোর মত প্রকাশ করে বলছে, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাব্যবস্থার নীতিমালা ও কার্যক্রম নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষা নয়, বরং মুনাফাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করছে। যদিও এ বিষয়ে আরও গভীর ও দায়িত্বশীল পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।
শিক্ষাবিদদের অভিমত, অবিলম্বে মেধা যাচাই পরীক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা, বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য কাঠামো তৈরি করা না হলে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
মেধা যাচাই পরীক্ষার নামে অনিশ্চয়তা, প্রশ্নের মুখে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা
মাজহারুল ইসলাম বাদলঃ
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের একত্রে মেধা যাচাই পরীক্ষার উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দেশের বৃহৎ একটি অংশের শিশু শিক্ষাজীবন শুরু করে। এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশ আসে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবার থেকে। তাদের পড়াশোনা নির্ভর করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরবরাহকৃত পাঠ্যবই ও বিদ্যালয়ের সীমিত সুযোগ-সুবিধার ওপর। অধিকাংশ অভিভাবকের পক্ষে গাইড বই, কোচিং কিংবা অতিরিক্ত শিক্ষাসামগ্রী কেনা সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রটি অনেকাংশেই নির্ভর করে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পাঠ্যসূচির ওপর।
অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই ইংরেজি মাধ্যম, অতিরিক্ত কোচিং, সহায়ক বই এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পাঠ্যচাপও লক্ষ্য করা যায়। ফলে একই বয়সী হলেও দুই ধারার শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, প্রস্তুতি ও আত্মবিশ্বাসে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়।
এই দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের শিক্ষার্থীদের এক কাতারে এনে মেধা যাচাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো কতটা যুক্তিসংগত—তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ। তাদের মতে, এটি প্রতিযোগিতার নামে একটি অসম লড়াই, যেখানে শুরু থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে।
বিতর্কের মধ্যেই কিন্ডারগার্টেন সংশ্লিষ্টদের করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে আদালত বন্ধ থাকা অবস্থায় প্রাথমিক মেধা যাচাই পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ আসে। কিন্তু এর পর দীর্ঘ সময় পার হলেও পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এতে করে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনেক শিক্ষার্থী প্রস্তুতি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে—পরীক্ষা হবে কি হবে না, হলে কোন নিয়মে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকায় তারা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন অস্থিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। তারা এটিকে এক ধরনের শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষা দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, যেখানে সুবিধাভোগী শ্রেণি আরও এগিয়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ে। এতে করে সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এবং এটিকে কখনোই বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অংশ করা উচিত নয়। শিশুদের শেখার পরিবেশ, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সময়োপযোগী ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় নীতিনির্ধারকদের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই প্রয়োজন একটি সমন্বিত, মানবিক ও বৈষম্যহীন নীতি, যেখানে প্রতিটি শিশুর শেখার অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত হবে।
কিছু মহল আরও কঠোর মত প্রকাশ করে বলছে, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাব্যবস্থার নীতিমালা ও কার্যক্রম নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষা নয়, বরং মুনাফাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করছে। যদিও এ বিষয়ে আরও গভীর ও দায়িত্বশীল পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।
শিক্ষাবিদদের অভিমত, অবিলম্বে মেধা যাচাই পরীক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা, বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য কাঠামো তৈরি করা না হলে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।