দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে গণপিটুনিতে হত্যা, চুরির অভিযোগে প্রাণ গেল কৃষিশ্রমিকের

আসলাম উদ্দিন, দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক কৃষিশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মারধরের শিকার হয়ে হীরা মিয়া (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ঘটনাটি রোববার (১৪ জুন) ভোরে উপজেলার শ্যামপুর টঙ্গীপাড়া আদিবাসী পল্লিতে ঘটে। এ ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে ঘটনার পর থেকেই সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় গ্রামের অনেক পুরুষ বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করছে।

নিহত হীরা মিয়া নবাবগঞ্জ উপজেলার জাটিহার গ্রামের মৃত আজিজার রহমানের ছেলে। তিনি পেশায় কৃষিশ্রমিক ছিলেন এবং দুই সন্তানের জনক। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ছিল এবং তিনি কিছুদিন কারাভোগও করেছিলেন। তবে সর্বশেষ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার ভোর আনুমানিক চারটার দিকে শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা অনিল টুডু তাঁর বাড়ির একটি ঘরের জানালার কাছে শব্দ শুনতে পান। ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসে তিনি একজন ব্যক্তিকে জানালার পাশে দেখতে পান বলে দাবি করেন। পরে তিনি ওই ব্যক্তিকে আটক করেন এবং আশপাশের লোকজনকে ডাক দেন। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হয়ে হীরা মিয়াকে মারধর করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই মারধরের একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি ঘটনাস্থলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সকাল ছয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় গণপিটুনিতে হত্যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। বিরামপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হারেজ উদ্দিন, নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুস এবং উপপরিদর্শক (এসআই) ডেভিড হিমাদ্রি বর্মণসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণপিটুনিতে হত্যা সংক্রান্ত এ ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কায় বাড়ির মালিক অনিল টুডুসহ গ্রামের বহু পুরুষ সদস্য এলাকা ছেড়ে গেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে পুরো গ্রামে এক ধরনের আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। সচেতন মহল বলছে, কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করাই উচিত। অন্যথায় গণপিটুনিতে হত্যা-র মতো ঘটনা সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিরামপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হারেজ উদ্দিন জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম শুরু করে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ চলছে। এ ঘটনায় নবাবগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গণপিটুনিতে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়। একজন মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার বিচার আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমেই হওয়া উচিত। নবাবগঞ্জের এই গণপিটুনিতে হত্যা ঘটনাটি আবারও জনসচেতনতা ও আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরোও পড়ুন – বিদ্যালয়ের কোটি টাকার অনিয়ম? প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠল এলাকাবাসী

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে গণপিটুনিতে হত্যা, চুরির অভিযোগে প্রাণ গেল কৃষিশ্রমিকের

জুন ১৪, ২০২৬

আসলাম উদ্দিন, দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক কৃষিশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মারধরের শিকার হয়ে হীরা মিয়া (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ঘটনাটি রোববার (১৪ জুন) ভোরে উপজেলার শ্যামপুর টঙ্গীপাড়া আদিবাসী পল্লিতে ঘটে। এ ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে ঘটনার পর থেকেই সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় গ্রামের অনেক পুরুষ বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করছে।

নিহত হীরা মিয়া নবাবগঞ্জ উপজেলার জাটিহার গ্রামের মৃত আজিজার রহমানের ছেলে। তিনি পেশায় কৃষিশ্রমিক ছিলেন এবং দুই সন্তানের জনক। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ছিল এবং তিনি কিছুদিন কারাভোগও করেছিলেন। তবে সর্বশেষ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার ভোর আনুমানিক চারটার দিকে শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা অনিল টুডু তাঁর বাড়ির একটি ঘরের জানালার কাছে শব্দ শুনতে পান। ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসে তিনি একজন ব্যক্তিকে জানালার পাশে দেখতে পান বলে দাবি করেন। পরে তিনি ওই ব্যক্তিকে আটক করেন এবং আশপাশের লোকজনকে ডাক দেন। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হয়ে হীরা মিয়াকে মারধর করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই মারধরের একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি ঘটনাস্থলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সকাল ছয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় গণপিটুনিতে হত্যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। বিরামপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হারেজ উদ্দিন, নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুস এবং উপপরিদর্শক (এসআই) ডেভিড হিমাদ্রি বর্মণসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণপিটুনিতে হত্যা সংক্রান্ত এ ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কায় বাড়ির মালিক অনিল টুডুসহ গ্রামের বহু পুরুষ সদস্য এলাকা ছেড়ে গেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে পুরো গ্রামে এক ধরনের আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। সচেতন মহল বলছে, কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করাই উচিত। অন্যথায় গণপিটুনিতে হত্যা-র মতো ঘটনা সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিরামপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হারেজ উদ্দিন জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম শুরু করে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ চলছে। এ ঘটনায় নবাবগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গণপিটুনিতে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়। একজন মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার বিচার আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমেই হওয়া উচিত। নবাবগঞ্জের এই গণপিটুনিতে হত্যা ঘটনাটি আবারও জনসচেতনতা ও আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরোও পড়ুন – বিদ্যালয়ের কোটি টাকার অনিয়ম? প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠল এলাকাবাসী