নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ প্রতিদিন
আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নারী, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া এই নারী পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখে পরিণত হন।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা, বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন, কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং শেষ জীবনের নানা সংকট—সবকিছুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি রেখে গেছেন একটি দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক অধ্যায়।
তাই জীবদ্দশায় যে নেত্রীকে সমর্থকেরা ‘দেশনেত্রী’, ‘আপোষহীন নেত্রী’ ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করতেন, তাঁর ৮১তম জন্মবার্ষিকী এবার পালিত হচ্ছে গভীর শোক ও স্মৃতির আবহে। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজে তাঁর প্রভাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পুতুল থেকে দেশনেত্রী
বেগম খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম ছিল খালেদা খানম। ছোটবেলায় পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি ‘পুতুল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরিবারের আদি নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী এলাকায়। জলপাইগুড়িতে বাবার ব্যবসায়িক অবস্থানের সময় সেখানে তাঁর জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবার দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
দিনাজপুরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। একই বছর তৎকালীন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
পরবর্তীতে স্বামী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আসার পর বেগম খালেদা জিয়া দেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে পরিচিতি পান। তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রকৃত বিকাশ ঘটে স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর। সেখান থেকেই শুরু হয় একজন গৃহবধূর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা।
স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতির কঠিন পথে
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সে সময় বেগম খালেদা জিয়া সরাসরি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
১৯৮০-এর দশকে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব ধীরে ধীরে দলটিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করে।
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এই সময় থেকেই ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচিতি আরও দৃঢ় হয়।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভের পর বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি শুধু বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধানদের মধ্যে অন্যতম প্রথম ব্যক্তিত্ব হিসেবেও ইতিহাসে জায়গা করে নেন।
তাঁর প্রথম সরকার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়।
তাঁর সরকারের সময় শিক্ষা, অর্থনীতি, অবকাঠামো, বেসরকারি খাত এবং বৈদেশিক বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ নতুনভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিরোধী নেত্রী হিসেবে সক্রিয় থাকেন।
আবারও রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সরকার পরিচালনা করেন। বাংলাপিডিয়াও তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কাল ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই সময় দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, শিল্প, বেসরকারি খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা ছিল।
একজন রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়নে যেমন তাঁর অর্জন থাকে, তেমনি বিতর্কও থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান প্রতীক হিসেবে দেখেছেন; বিরোধীরা তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন।
তবে সব বিতর্কের মধ্যেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
গণতন্ত্রের আন্দোলনে দীর্ঘ পথচলা
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিএনপির রাজনীতিতে ‘আপোষহীনতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হয়ে ওঠে। দলটির নেতাকর্মীরা তাঁকে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তীব্র বিরোধ, রাজপথের আন্দোলন, হরতাল-অবরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন।
একদিকে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকা—দুই অভিজ্ঞতাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে বহুমাত্রিক করেছে।
কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ রাজনৈতিক অধ্যায় ছিল অত্যন্ত কঠিন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। পরবর্তী সময়ে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সরকার তাঁর সাজা স্থগিত করে বাসায় থাকার সুযোগ দেয়। তাঁর দল ও সমর্থকেরা মামলাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁর কারাবাস ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
দীর্ঘদিন তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে ছিলেন। কিন্তু বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব বজায় ছিল।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগও পান এবং দেশে ফিরে আসেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই জটিল হতে থাকে।
অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই
জীবনের শেষ কয়েক বছর নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন বেগম খালেদা জিয়া। হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা তাঁকে ভোগাচ্ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে তিনি মারা যান। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
শেষ বিদায়ে মানুষের ঢল
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যে নেত্রী মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, মৃত্যুর পরও মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তার একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন হিসেবে সামনে আসে।
শোকাহত মানুষ ফুল, ব্যানার ও নানা স্লোগানের মধ্য দিয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানায়। বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুর পর এমন ব্যাপক জনসমাগম তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
বিএনপিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে বেগম খালেদা জিয়ার ওপর।
তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক বিস্তার ঘটে। রাজনীতিতে বিএনপির একটি বড় জনভিত্তি গড়ে ওঠে।
বিএনপির সমর্থকদের মতে, নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া, বিরোধী দলে দীর্ঘ আন্দোলন করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দলের নেতৃত্ব ধরে রাখা—এসব কারণে তিনি বিএনপির ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে আছেন।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও তারেক রহমান
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোচনায় তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের নাম স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং ২০১৮ সাল থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় অর্জন করে। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরাসরি নির্বাচিত ৩০০ আসনের মধ্যে ২১০টি আসন লাভ করে।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথ পড়ান।
ফলে বেগম খালেদা জিয়ার ৮১তম জন্মবার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক পরিবারের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিএনপির ইতিহাসেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
মায়ের রাজনৈতিক আদর্শের উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান
বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তারেক রহমানকে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বড় বিজয়ের পর তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। রেকর্ডে দেখা যায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর শপথের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
এখন তাঁর সামনে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি পুনর্গঠন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এসব চ্যালেঞ্জের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ পরিচিতি
বেগম খালেদা জিয়ার সমর্থকেরা তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ বা ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর পেছনে রয়েছে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের ইতিহাস।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বহুবার ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। কখনো সরকারপ্রধান, কখনো বিরোধীদলীয় নেত্রী—দুই ভূমিকাতেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে এসব বিষয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।
একজন নারী নেত্রীর অসাধারণ উত্থান
বাংলাদেশের মতো একটি পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক পরিবেশে একজন সাধারণ গৃহবধূর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে উঠে আসা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল প্রচলিত অর্থে কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ফল নয়। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যেই জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন।
১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এই দুই নারী নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে।
ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে শুধু বিএনপির ইতিহাস দিয়ে বিচার করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও প্রভাবশালী চরিত্র ছিলেন।
তাঁর সময়ে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, নির্বাচন হয়েছে এবং গণতন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে দেশ।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেমন সাফল্যে পূর্ণ, তেমনি বিতর্ক ও সমালোচনাতেও পরিপূর্ণ। কিন্তু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর প্রভাব যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তাঁর মৃত্যু সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি সমাপ্তি ঘটালেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনো সক্রিয়। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সেই উত্তরাধিকারকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
আজ জন্মদিনে স্মরণ
এবারের ১৫ আগস্ট তাই অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে আলাদা। জীবিত অবস্থায় এই দিনটি ছিল তাঁর জন্মদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মুখর। এবার তিনি নেই; আছে তাঁর স্মৃতি, রাজনৈতিক দর্শন, সংগ্রামের ইতিহাস এবং কোটি মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া নানা অনুভূতি।
বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি শুধু দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না; তিনি ছিলেন দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্বদাতা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন, কারাবাস, অসুস্থতা এবং শেষ বিদায়ের স্মৃতি আজও দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর আবেগ তৈরি করে।
একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তাঁর কর্ম, চিন্তা ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন সমাজে বেঁচে থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে বহু আলোচনা রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
এই ধারাবাহিকতা বিএনপির রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন সেই নেতৃত্বকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখাতে হবে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা শক্তিশালীভাবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে প্রভাব ফেলবে, সেটি নির্ভর করবে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্যের ওপর।
শেষ কথা
আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন একটি নাম, যাকে বাদ দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বড় একটি অধ্যায় লেখা সম্ভব নয়। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে উঠে আসা, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া, বিরোধী দলে থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিচয় ধরে রাখা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল ও ঐতিহাসিক।
তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে দেখেছেন গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে। সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রভাব ছিল ব্যাপক এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে। কিন্তু ১৫ আগস্ট এলেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসবে।
আজ তাঁর ৮১তম জন্মবার্ষিকীতে তাই তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা।
আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া—নামটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ সময়ের প্রতীক হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁর অবস্থান যে গুরুত্বপূর্ণ, তা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
আরোও পড়ুন – শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফর নয়: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া: সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও মানুষের ভালোবাসায় এক জীবন্ত ইতিহাস
নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ প্রতিদিন
আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নারী, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া এই নারী পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখে পরিণত হন।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা, বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন, কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং শেষ জীবনের নানা সংকট—সবকিছুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি রেখে গেছেন একটি দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক অধ্যায়।
তাই জীবদ্দশায় যে নেত্রীকে সমর্থকেরা ‘দেশনেত্রী’, ‘আপোষহীন নেত্রী’ ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করতেন, তাঁর ৮১তম জন্মবার্ষিকী এবার পালিত হচ্ছে গভীর শোক ও স্মৃতির আবহে। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজে তাঁর প্রভাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পুতুল থেকে দেশনেত্রী
বেগম খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম ছিল খালেদা খানম। ছোটবেলায় পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি ‘পুতুল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরিবারের আদি নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী এলাকায়। জলপাইগুড়িতে বাবার ব্যবসায়িক অবস্থানের সময় সেখানে তাঁর জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবার দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
দিনাজপুরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। একই বছর তৎকালীন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
পরবর্তীতে স্বামী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আসার পর বেগম খালেদা জিয়া দেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে পরিচিতি পান। তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রকৃত বিকাশ ঘটে স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর। সেখান থেকেই শুরু হয় একজন গৃহবধূর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা।
স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতির কঠিন পথে
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সে সময় বেগম খালেদা জিয়া সরাসরি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
১৯৮০-এর দশকে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব ধীরে ধীরে দলটিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করে।
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এই সময় থেকেই ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচিতি আরও দৃঢ় হয়।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভের পর বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি শুধু বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধানদের মধ্যে অন্যতম প্রথম ব্যক্তিত্ব হিসেবেও ইতিহাসে জায়গা করে নেন।
তাঁর প্রথম সরকার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়।
তাঁর সরকারের সময় শিক্ষা, অর্থনীতি, অবকাঠামো, বেসরকারি খাত এবং বৈদেশিক বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ নতুনভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিরোধী নেত্রী হিসেবে সক্রিয় থাকেন।
আবারও রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সরকার পরিচালনা করেন। বাংলাপিডিয়াও তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কাল ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই সময় দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, শিল্প, বেসরকারি খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা ছিল।
একজন রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়নে যেমন তাঁর অর্জন থাকে, তেমনি বিতর্কও থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান প্রতীক হিসেবে দেখেছেন; বিরোধীরা তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন।
তবে সব বিতর্কের মধ্যেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
গণতন্ত্রের আন্দোলনে দীর্ঘ পথচলা
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিএনপির রাজনীতিতে ‘আপোষহীনতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হয়ে ওঠে। দলটির নেতাকর্মীরা তাঁকে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তীব্র বিরোধ, রাজপথের আন্দোলন, হরতাল-অবরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন।
একদিকে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকা—দুই অভিজ্ঞতাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে বহুমাত্রিক করেছে।
কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ রাজনৈতিক অধ্যায় ছিল অত্যন্ত কঠিন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। পরবর্তী সময়ে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সরকার তাঁর সাজা স্থগিত করে বাসায় থাকার সুযোগ দেয়। তাঁর দল ও সমর্থকেরা মামলাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁর কারাবাস ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
দীর্ঘদিন তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে ছিলেন। কিন্তু বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব বজায় ছিল।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগও পান এবং দেশে ফিরে আসেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই জটিল হতে থাকে।
অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই
জীবনের শেষ কয়েক বছর নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন বেগম খালেদা জিয়া। হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা তাঁকে ভোগাচ্ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে তিনি মারা যান। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
শেষ বিদায়ে মানুষের ঢল
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যে নেত্রী মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, মৃত্যুর পরও মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তার একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন হিসেবে সামনে আসে।
শোকাহত মানুষ ফুল, ব্যানার ও নানা স্লোগানের মধ্য দিয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানায়। বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুর পর এমন ব্যাপক জনসমাগম তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
বিএনপিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে বেগম খালেদা জিয়ার ওপর।
তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক বিস্তার ঘটে। রাজনীতিতে বিএনপির একটি বড় জনভিত্তি গড়ে ওঠে।
বিএনপির সমর্থকদের মতে, নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া, বিরোধী দলে দীর্ঘ আন্দোলন করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দলের নেতৃত্ব ধরে রাখা—এসব কারণে তিনি বিএনপির ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে আছেন।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও তারেক রহমান
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোচনায় তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের নাম স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং ২০১৮ সাল থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় অর্জন করে। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরাসরি নির্বাচিত ৩০০ আসনের মধ্যে ২১০টি আসন লাভ করে।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথ পড়ান।
ফলে বেগম খালেদা জিয়ার ৮১তম জন্মবার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক পরিবারের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিএনপির ইতিহাসেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
মায়ের রাজনৈতিক আদর্শের উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান
বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তারেক রহমানকে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বড় বিজয়ের পর তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। রেকর্ডে দেখা যায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর শপথের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
এখন তাঁর সামনে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি পুনর্গঠন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এসব চ্যালেঞ্জের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ পরিচিতি
বেগম খালেদা জিয়ার সমর্থকেরা তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ বা ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর পেছনে রয়েছে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের ইতিহাস।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বহুবার ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। কখনো সরকারপ্রধান, কখনো বিরোধীদলীয় নেত্রী—দুই ভূমিকাতেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে এসব বিষয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।
একজন নারী নেত্রীর অসাধারণ উত্থান
বাংলাদেশের মতো একটি পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক পরিবেশে একজন সাধারণ গৃহবধূর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে উঠে আসা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল প্রচলিত অর্থে কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ফল নয়। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যেই জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন।
১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এই দুই নারী নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে।
ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে শুধু বিএনপির ইতিহাস দিয়ে বিচার করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও প্রভাবশালী চরিত্র ছিলেন।
তাঁর সময়ে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, নির্বাচন হয়েছে এবং গণতন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে দেশ।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেমন সাফল্যে পূর্ণ, তেমনি বিতর্ক ও সমালোচনাতেও পরিপূর্ণ। কিন্তু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর প্রভাব যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তাঁর মৃত্যু সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি সমাপ্তি ঘটালেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনো সক্রিয়। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সেই উত্তরাধিকারকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
আজ জন্মদিনে স্মরণ
এবারের ১৫ আগস্ট তাই অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে আলাদা। জীবিত অবস্থায় এই দিনটি ছিল তাঁর জন্মদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মুখর। এবার তিনি নেই; আছে তাঁর স্মৃতি, রাজনৈতিক দর্শন, সংগ্রামের ইতিহাস এবং কোটি মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া নানা অনুভূতি।
বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি শুধু দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না; তিনি ছিলেন দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্বদাতা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন, কারাবাস, অসুস্থতা এবং শেষ বিদায়ের স্মৃতি আজও দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর আবেগ তৈরি করে।
একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তাঁর কর্ম, চিন্তা ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন সমাজে বেঁচে থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে বহু আলোচনা রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
এই ধারাবাহিকতা বিএনপির রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন সেই নেতৃত্বকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখাতে হবে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা শক্তিশালীভাবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে প্রভাব ফেলবে, সেটি নির্ভর করবে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্যের ওপর।
শেষ কথা
আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন একটি নাম, যাকে বাদ দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বড় একটি অধ্যায় লেখা সম্ভব নয়। গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে উঠে আসা, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া, বিরোধী দলে থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিচয় ধরে রাখা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল ও ঐতিহাসিক।
তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে দেখেছেন গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে। সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রভাব ছিল ব্যাপক এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে। কিন্তু ১৫ আগস্ট এলেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসবে।
আজ তাঁর ৮১তম জন্মবার্ষিকীতে তাই তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা।
আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া—নামটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ সময়ের প্রতীক হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁর অবস্থান যে গুরুত্বপূর্ণ, তা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
আরোও পড়ুন – শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফর নয়: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান