টঙ্গীর সরকারি কবরস্থানে দাফন সংকট: খাস জমি নিয়ে মালিকানা দাবিতে মানবিক বিপর্যয়

মাহাবুল ইসলামঃ

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী এলাকার ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের আউচ পাড়ার খাঁ পাড়া এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারি কবরস্থানে মৃত ব্যক্তির দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে ব্যবহৃত একটি সরকারি খাস জমিকে হঠাৎ করে ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে দাফন কার্যক্রম বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। এতে করে শোকাহত পরিবারগুলোর পাশাপাশি পুরো এলাকাজুড়ে মানবিক সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ১১ বিঘা আয়তনের এই জমিটি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে সাত শতাধিক কবর রয়েছে। এলাকাবাসীর একাধিক প্রজন্ম এখানে তাদের স্বজনদের দাফন করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবরস্থানটিতে সরকারি বরাদ্দে স্থাপনা নির্মাণ, সীমানা নির্ধারণ ও সংস্কার কাজও হয়েছে। এসব কারণে এলাকাবাসীর কাছে এটি কখনোই ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো জমি হিসেবে পরিচিত ছিল না।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি পক্ষ জমিটির ওপর মালিকানা দাবি তুলে কবরস্থানে দাফন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্টের পর আতাউর রহমান নামে এক ব্যক্তি নিজেকে জমিটির বৈধ মালিক দাবি করে কবরস্থানের প্রবেশমুখে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। এর পরপরই কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় আকরাম হোসেন নামের আরেক ব্যক্তিকে। এই ঘটনার পর থেকেই কবরস্থানে দাফন নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হতে শুরু করে।
সম্প্রতি এলাকায় একজন বাসিন্দার মৃত্যুর পর কবর খোঁড়াখুঁড়ি সম্পন্ন হলেও শেষ মুহূর্তে দাফনে বাধা দেওয়া হয়। বাধার মুখে পড়ে শোকাহত পরিবারটিকে মরদেহ অন্য এলাকায় নিয়ে দাফন করতে বাধ্য হতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল মুহূর্তেও তারা নিজ এলাকার কবরস্থানে দাফনের নিশ্চয়তা পাবেন না।
এলাকাবাসীর দাবি, কবরস্থানটি নিয়ে যে মালিকানার কথা বলা হচ্ছে, তা হঠাৎ করেই সামনে আনা হয়েছে। তাদের মতে, এত বছর ধরে সরকারি খাস জমি হিসেবে ব্যবহৃত একটি জায়গা হঠাৎ করে ব্যক্তিমালিকানা দাবি করার পেছনে রহস্য রয়েছে। বিষয়টি ঘিরে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, কবরস্থানটি সরকারি খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত করে অতীতে একাধিকবার প্রশাসনের উদ্যোগে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যা এই জমির সরকারি চরিত্রকেই নির্দেশ করে।
তদন্তে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে নাছির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি এই সরকারি খাস জমির ওপর মালিকানা দাবি করে মামলা দায়ের করেন, যেখানে সরকারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটি দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর ধরে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। নাছির উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার হিসেবে আতাউর রহমান মামলাটি পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলেও স্থানীয়ভাবে মালিকানা দাবি করে কবরস্থানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অদৃশ্য প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে কয়েক দফা মামলার রায় মালিকানা দাবি করা পক্ষের অনুকূলে গেছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। প্রশাসনের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থানের অভাব দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। ফলে কবরস্থানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শেখ মো. আলেক জানান, তিনি জন্মের পর থেকেই জায়গাটিকে সরকারি খাস জমির কবরস্থান হিসেবেই জেনে এসেছেন। তার মতে, টঙ্গী এলাকায় কবরস্থানের জায়গা এমনিতেই সীমিত। এই অবস্থায় দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত একটি কবরস্থান বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করবে। তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
মালিকপক্ষ দাবি করা আতাউর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্বে থাকা আকরাম হোসেন জানান, তিনি জমির মালিক নন এবং কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে কাজ করছেন। তার দাবি, দাফনে বাধার সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষের, তার ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত এতে জড়িত নয়।
এ বিষয়ে গাজীপুরের একজন দায়িত্বশীল রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, মামলার বাদীপক্ষ উচ্চ আদালত থেকে রায় পেয়েছে বলে তারা মৌখিকভাবে অবগত হয়েছেন। তবে রায়ের কপি ও আইনি অবস্থান যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। চূড়ান্ত রায় ও স্পষ্ট সরকারি নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত কেউ অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ বা দাফনে বাধা দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, উদ্বেগ ও মানবিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জীবনের শেষ ঠিকানা হিসেবে পরিচিত কবরস্থানে ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’ পাওয়ার অধিকার নিয়েও যখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন তা সমাজের জন্য গভীর সংকেত বহন করে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিয়ে এই দীর্ঘদিনের কবরস্থানকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতার অবসান ঘটাবে এবং সাধারণ মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকার নিশ্চিত করবে।

টঙ্গীর সরকারি কবরস্থানে দাফন সংকট: খাস জমি নিয়ে মালিকানা দাবিতে মানবিক বিপর্যয়

জানুয়ারি ১৩, ২০২৬

মাহাবুল ইসলামঃ

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী এলাকার ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের আউচ পাড়ার খাঁ পাড়া এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারি কবরস্থানে মৃত ব্যক্তির দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে ব্যবহৃত একটি সরকারি খাস জমিকে হঠাৎ করে ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে দাফন কার্যক্রম বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। এতে করে শোকাহত পরিবারগুলোর পাশাপাশি পুরো এলাকাজুড়ে মানবিক সংকট ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ১১ বিঘা আয়তনের এই জমিটি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে সাত শতাধিক কবর রয়েছে। এলাকাবাসীর একাধিক প্রজন্ম এখানে তাদের স্বজনদের দাফন করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবরস্থানটিতে সরকারি বরাদ্দে স্থাপনা নির্মাণ, সীমানা নির্ধারণ ও সংস্কার কাজও হয়েছে। এসব কারণে এলাকাবাসীর কাছে এটি কখনোই ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো জমি হিসেবে পরিচিত ছিল না।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি পক্ষ জমিটির ওপর মালিকানা দাবি তুলে কবরস্থানে দাফন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্টের পর আতাউর রহমান নামে এক ব্যক্তি নিজেকে জমিটির বৈধ মালিক দাবি করে কবরস্থানের প্রবেশমুখে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। এর পরপরই কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় আকরাম হোসেন নামের আরেক ব্যক্তিকে। এই ঘটনার পর থেকেই কবরস্থানে দাফন নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হতে শুরু করে।
সম্প্রতি এলাকায় একজন বাসিন্দার মৃত্যুর পর কবর খোঁড়াখুঁড়ি সম্পন্ন হলেও শেষ মুহূর্তে দাফনে বাধা দেওয়া হয়। বাধার মুখে পড়ে শোকাহত পরিবারটিকে মরদেহ অন্য এলাকায় নিয়ে দাফন করতে বাধ্য হতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল মুহূর্তেও তারা নিজ এলাকার কবরস্থানে দাফনের নিশ্চয়তা পাবেন না।
এলাকাবাসীর দাবি, কবরস্থানটি নিয়ে যে মালিকানার কথা বলা হচ্ছে, তা হঠাৎ করেই সামনে আনা হয়েছে। তাদের মতে, এত বছর ধরে সরকারি খাস জমি হিসেবে ব্যবহৃত একটি জায়গা হঠাৎ করে ব্যক্তিমালিকানা দাবি করার পেছনে রহস্য রয়েছে। বিষয়টি ঘিরে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, কবরস্থানটি সরকারি খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত করে অতীতে একাধিকবার প্রশাসনের উদ্যোগে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যা এই জমির সরকারি চরিত্রকেই নির্দেশ করে।
তদন্তে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে নাছির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি এই সরকারি খাস জমির ওপর মালিকানা দাবি করে মামলা দায়ের করেন, যেখানে সরকারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটি দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর ধরে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। নাছির উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার হিসেবে আতাউর রহমান মামলাটি পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলেও স্থানীয়ভাবে মালিকানা দাবি করে কবরস্থানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অদৃশ্য প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে কয়েক দফা মামলার রায় মালিকানা দাবি করা পক্ষের অনুকূলে গেছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। প্রশাসনের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থানের অভাব দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। ফলে কবরস্থানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শেখ মো. আলেক জানান, তিনি জন্মের পর থেকেই জায়গাটিকে সরকারি খাস জমির কবরস্থান হিসেবেই জেনে এসেছেন। তার মতে, টঙ্গী এলাকায় কবরস্থানের জায়গা এমনিতেই সীমিত। এই অবস্থায় দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত একটি কবরস্থান বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করবে। তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
মালিকপক্ষ দাবি করা আতাউর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্বে থাকা আকরাম হোসেন জানান, তিনি জমির মালিক নন এবং কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে কাজ করছেন। তার দাবি, দাফনে বাধার সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষের, তার ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত এতে জড়িত নয়।
এ বিষয়ে গাজীপুরের একজন দায়িত্বশীল রাজস্ব কর্মকর্তা জানান, মামলার বাদীপক্ষ উচ্চ আদালত থেকে রায় পেয়েছে বলে তারা মৌখিকভাবে অবগত হয়েছেন। তবে রায়ের কপি ও আইনি অবস্থান যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। চূড়ান্ত রায় ও স্পষ্ট সরকারি নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত কেউ অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ বা দাফনে বাধা দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, উদ্বেগ ও মানবিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জীবনের শেষ ঠিকানা হিসেবে পরিচিত কবরস্থানে ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’ পাওয়ার অধিকার নিয়েও যখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন তা সমাজের জন্য গভীর সংকেত বহন করে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিয়ে এই দীর্ঘদিনের কবরস্থানকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতার অবসান ঘটাবে এবং সাধারণ মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকার নিশ্চিত করবে।