হালুয়াঘাটে ১২ বছরের শাওনের সংগ্রাম: বাবার চিকিৎসায় নিঃস্ব পরিবার

হালুয়াঘাট প্রতিনিধি | মোস্তফা কামাল জয়

ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার ধারা ইউনিয়নের কয়রাহাটি গ্রামে ছোট্ট এক শিশুর জীবন এখন পুরোপুরি সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মাত্র ১২ বছর বয়সেই যে ছেলেটির হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা ও স্কুলের ব্যাগ, সেই শাওনের কাঁধে এখন পরিবারের দায়িত্ব, বাবার চিকিৎসা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বোঝা। এই পুরো পরিস্থিতিই আজ পরিচিত হয়ে উঠেছে স্থানীয়ভাবে “শাওনের সংগ্রাম” নামে, যা এক বাস্তব মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে।

শাওনের বাবা আ. খালেক এক সময় পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। কিন্তু এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে দেয়। দুর্ঘটনার পর উন্নত চিকিৎসার আশায় পরিবার তাদের সামান্য সম্পদ পর্যন্ত বিক্রি করে দেয়। দীর্ঘ চিকিৎসা, ওষুধ ও পুনর্বাসনের খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তবুও সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়ায় আ. খালেক এখন শয্যাশায়ী ও হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতিই শাওনের সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

পরিবারের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শাওনের মা ফজিলা খাতুন (৫৫) শারীরিকভাবে দুর্বল এবং মানসিকভাবে অসুস্থ। সংসারের ভার সামলানোর মতো কোনো সক্ষমতা তার নেই। দুই বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর এই পরিবারে এখন একমাত্র কর্মক্ষম ভরসা ছোট্ট শাওন। ফলে অল্প বয়সেই “শাওনের সংগ্রাম” শুরু হয়, যেখানে তাকে বাবাকে দেখাশোনা, বাজার করা এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়।

দুর্ঘটনার আগে শাওন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র ছিল। লেখাপড়া, খেলাধুলা ও স্বপ্নে ভরা তার শৈশব হঠাৎ করেই থেমে যায়। বাবার দুর্ঘটনার পর পরিবার আর তার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারেনি। ফলে স্কুলের বই-খাতা বন্ধ হয়ে যায়। আজকের দিনে তার শৈশব নয়, বরং প্রতিদিনই শাওনের সংগ্রাম তাকে হাট-বাজারে নিয়ে যায় মানুষের সাহায্যের আশায়।

শাওন জানায়, প্রতিদিন সকালে বাবাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে সে বাজারে বা রাস্তার পাশে যায়। সেখানে কেউ সাহায্য করলে তা দিয়েই বাবার ওষুধ ও সংসারের খরচ চালাতে হয়। অনেক সময় তাকে অচেনা মানুষের সামনে হাত পাততে হয়, যা তার শিশুমনকে কষ্ট দেয়। তবুও পরিবারকে বাঁচাতে সে প্রতিদিন এই কঠিন পথই বেছে নেয়, যা সত্যিকার অর্থে শাওনের সংগ্রামের বাস্তব রূপ।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। কোনো জমি-জমা না থাকায় তারা সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দুর্ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে শাওনের সংগ্রাম দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে এবং পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

এদিকে শাওনের বাবার বক্তব্যও হৃদয়বিদারক। আ. খালেক বলেন, তিনি এখন সম্পূর্ণভাবে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসার কারণে যে ঋণ হয়েছে তা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আমি এখন কিছুই করতে পারি না। ছেলেটাকেই নিয়ে মানুষের কাছে যেতে হয়। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট।” এই বক্তব্য শাওনের সংগ্রামের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও প্রতিবেশীরা বলছেন, পরিবারটির দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে শাওনের সংগ্রাম আরও দীর্ঘ ও কঠিন হয়ে উঠবে। তারা মনে করেন, এ ধরনের পরিবারগুলো সমাজের বিশেষ নজরে না এলে ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।

হালুয়াঘাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সানিয়াত সন্ধানী জানান, যদি পরিবারটি প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় না এসে থাকে, তাহলে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য চিকিৎসা সহায়তার সুযোগ রয়েছে, যা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে স্থানীয়রা দাবি করছেন, বাস্তব সহায়তা দ্রুত না এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

শাওনের সংগ্রাম শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য, চিকিৎসা সংকট এবং শিশুদের ভেঙে পড়া শৈশবের বাস্তব চিত্র। একদিকে অসুস্থ বাবা, অন্যদিকে অসহায় মা এই দুই বিপর্যয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে শাওন আজ পরিবারের একমাত্র আশা। তার ছোট্ট কাঁধে যে দায়িত্ব চাপানো হয়েছে, তা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্যও কঠিন। তবুও সে লড়ছে প্রতিদিন।

স্থানীয় গ্রামবাসীরা বলছেন, যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে আসে তাহলে শাওনের জীবন আবারও স্বাভাবিক হতে পারে। তাকে স্কুলে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এখন প্রয়োজন দ্রুত উদ্যোগ। না হলে শাওনের সংগ্রাম আরও দীর্ঘ হবে এবং তার শৈশব চিরতরে হারিয়ে যাবে কঠিন বাস্তবতার ভেতরে।

আরোও পড়ুন – হালুয়াঘাটে কাঠের সেতু উদ্বোধন, যাতায়াতে স্বস্তি

হালুয়াঘাটে ১২ বছরের শাওনের সংগ্রাম: বাবার চিকিৎসায় নিঃস্ব পরিবার

এপ্রিল ২০, ২০২৬

হালুয়াঘাট প্রতিনিধি | মোস্তফা কামাল জয়

ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার ধারা ইউনিয়নের কয়রাহাটি গ্রামে ছোট্ট এক শিশুর জীবন এখন পুরোপুরি সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মাত্র ১২ বছর বয়সেই যে ছেলেটির হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা ও স্কুলের ব্যাগ, সেই শাওনের কাঁধে এখন পরিবারের দায়িত্ব, বাবার চিকিৎসা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বোঝা। এই পুরো পরিস্থিতিই আজ পরিচিত হয়ে উঠেছে স্থানীয়ভাবে “শাওনের সংগ্রাম” নামে, যা এক বাস্তব মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে।

শাওনের বাবা আ. খালেক এক সময় পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। কিন্তু এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে দেয়। দুর্ঘটনার পর উন্নত চিকিৎসার আশায় পরিবার তাদের সামান্য সম্পদ পর্যন্ত বিক্রি করে দেয়। দীর্ঘ চিকিৎসা, ওষুধ ও পুনর্বাসনের খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তবুও সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়ায় আ. খালেক এখন শয্যাশায়ী ও হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতিই শাওনের সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

পরিবারের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শাওনের মা ফজিলা খাতুন (৫৫) শারীরিকভাবে দুর্বল এবং মানসিকভাবে অসুস্থ। সংসারের ভার সামলানোর মতো কোনো সক্ষমতা তার নেই। দুই বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর এই পরিবারে এখন একমাত্র কর্মক্ষম ভরসা ছোট্ট শাওন। ফলে অল্প বয়সেই “শাওনের সংগ্রাম” শুরু হয়, যেখানে তাকে বাবাকে দেখাশোনা, বাজার করা এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়।

দুর্ঘটনার আগে শাওন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র ছিল। লেখাপড়া, খেলাধুলা ও স্বপ্নে ভরা তার শৈশব হঠাৎ করেই থেমে যায়। বাবার দুর্ঘটনার পর পরিবার আর তার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারেনি। ফলে স্কুলের বই-খাতা বন্ধ হয়ে যায়। আজকের দিনে তার শৈশব নয়, বরং প্রতিদিনই শাওনের সংগ্রাম তাকে হাট-বাজারে নিয়ে যায় মানুষের সাহায্যের আশায়।

শাওন জানায়, প্রতিদিন সকালে বাবাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে সে বাজারে বা রাস্তার পাশে যায়। সেখানে কেউ সাহায্য করলে তা দিয়েই বাবার ওষুধ ও সংসারের খরচ চালাতে হয়। অনেক সময় তাকে অচেনা মানুষের সামনে হাত পাততে হয়, যা তার শিশুমনকে কষ্ট দেয়। তবুও পরিবারকে বাঁচাতে সে প্রতিদিন এই কঠিন পথই বেছে নেয়, যা সত্যিকার অর্থে শাওনের সংগ্রামের বাস্তব রূপ।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। কোনো জমি-জমা না থাকায় তারা সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দুর্ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে শাওনের সংগ্রাম দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে এবং পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

এদিকে শাওনের বাবার বক্তব্যও হৃদয়বিদারক। আ. খালেক বলেন, তিনি এখন সম্পূর্ণভাবে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসার কারণে যে ঋণ হয়েছে তা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আমি এখন কিছুই করতে পারি না। ছেলেটাকেই নিয়ে মানুষের কাছে যেতে হয়। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট।” এই বক্তব্য শাওনের সংগ্রামের বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও প্রতিবেশীরা বলছেন, পরিবারটির দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে শাওনের সংগ্রাম আরও দীর্ঘ ও কঠিন হয়ে উঠবে। তারা মনে করেন, এ ধরনের পরিবারগুলো সমাজের বিশেষ নজরে না এলে ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।

হালুয়াঘাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সানিয়াত সন্ধানী জানান, যদি পরিবারটি প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় না এসে থাকে, তাহলে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য চিকিৎসা সহায়তার সুযোগ রয়েছে, যা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে স্থানীয়রা দাবি করছেন, বাস্তব সহায়তা দ্রুত না এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

শাওনের সংগ্রাম শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য, চিকিৎসা সংকট এবং শিশুদের ভেঙে পড়া শৈশবের বাস্তব চিত্র। একদিকে অসুস্থ বাবা, অন্যদিকে অসহায় মা এই দুই বিপর্যয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে শাওন আজ পরিবারের একমাত্র আশা। তার ছোট্ট কাঁধে যে দায়িত্ব চাপানো হয়েছে, তা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্যও কঠিন। তবুও সে লড়ছে প্রতিদিন।

স্থানীয় গ্রামবাসীরা বলছেন, যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে আসে তাহলে শাওনের জীবন আবারও স্বাভাবিক হতে পারে। তাকে স্কুলে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এখন প্রয়োজন দ্রুত উদ্যোগ। না হলে শাওনের সংগ্রাম আরও দীর্ঘ হবে এবং তার শৈশব চিরতরে হারিয়ে যাবে কঠিন বাস্তবতার ভেতরে।

আরোও পড়ুন – হালুয়াঘাটে কাঠের সেতু উদ্বোধন, যাতায়াতে স্বস্তি