শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টারঃ
ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব, রোমাঞ্চকর এবং মানবিক ঐক্যের অনন্য দলিল হলো ‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (Great Bitter Lake Association বা GBLA)। এটি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক বা পেশাদার সংগঠন ছিল না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়া ৮টি ভিন্ন দেশের ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের তৈরি করা একটি অনন্য ‘স্বঘোষিত রাষ্ট্র’ বা ক্ষুদ্র সমাজ।
ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বৈরিতা মানুষকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সুয়েজ খালে ঘটেছিল সম্পূর্ণ উলটো এক ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রের ঠিক মাঝখানে আটকা পড়েছিল ৮টি দেশের ১৪টি পণ্যবাহী জাহাজ। দীর্ঘ ৮ বছর (১৯৬৭-১৯৭৫) এক জায়গায় অবরুদ্ধ থাকার পর, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা দূর করতে নাবিকেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন এক অভূতপূর্ব জোট, যার নাম ‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA)। মরুভূমির ধূলিকণায় জাহাজগুলোর রং কালচে-হলুদ হয়ে যাওয়ায় ইতিহাসে এই জাহাজগুলোকে একসাথে ‘দ্য ইয়েলো ফ্লিট’ (The Yellow Fleet) বা হলুদ নৌবহর বলা হয়।
১৯৬৭ সালের ৫ জুন ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলোর (মিশর, সিরিয়া, জর্ডান) মধ্যে বিখ্যাত ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ (Six-Day War) শুরু হয়। সেই মুহূর্তে সুয়েজ খাল দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছিল ১৪টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ। যুদ্ধ শুরু হতেই, মিশরীয় কর্তৃপক্ষ সুয়েজ খালের দুই প্রান্তেই নিজেদের যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য নৌযান ডুবিয়ে এবং মাইন পেতে খালের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
ফলে জাহাজগুলোর সামনে বা পেছনে যাওয়ার কোনো পথ খোলা ছিল না। বাধ্য হয়ে জাহাজগুলো সুয়েজ খালের সবচেয়ে প্রশস্ত অংশ-‘গ্রেট বিটার লেক’-এ নোঙর করে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল যুদ্ধ শেষ হলে খোলসা হবে পথ, কিন্তু মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ইজরায়েলকে সুয়েজ খাল ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় এই অবরোধ দীর্ঘ ৮ বছর স্থায়ী হয়।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও খালের অবরোধ কাটছিল না। মাসের পর মাস সাগরের মাঝে অলস বসে থাকায় নাবিকদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও একাকিত্ব ভর করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে ব্রিটিশ জাহাজ ‘মেলাম্পাস’ (MS Melampus)-এর ওপর সব জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদল একটি সভায় মিলিত হন। সেখানেই জন্ম নেয় ‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA)।
এই অ্যাসোসিয়েশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব এবং বন্দি জীবনকে আনন্দময় করে তোলা। জাহাজগুলোর মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আন্তর্জাতিক বৈচিত্র। জাহাজ গুলোর মধ্য ছিল, যুক্তরাজ্য (৪ টি জাহাজ), পশ্চিম জার্মানি (২ টি জাহাজ), পোল্যান্ড (২ টি জাহাজ), যুক্তরাষ্ট্র (২ টি জাহাজ), সুইডেন (২ টি জাহাজ), ফ্রান্স, বুলগেরিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া (১ টি করে জাহাজ)। দ্য ইয়েলো ফ্লিট (The Yellow Fleet): সুয়েজ খালে আটকে পড়া সমস্ত জাহাজকে একসাথে ‘হলুদ নৌবহর’ বলা হয়, যার সংখ্যা ছিল ১৫ টি (১৪ টি গ্রেট বিটার লেকে, ১ টি লেক তিমসাহ-তে)।
গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন (GBLA), এটি ছিল একটি সামাজিক সংগঠন। যেহেতু SS Observer ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে গ্রেট বিটার লেকের ফুটবল ম্যাচ, সিনেমা হল বা অলিম্পিকে অংশ নিতে পারত না, তাই সে এই অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল মেম্বার হতে পারেনি। কেবল গ্রেট বিটার লেকে থাকা ১৪টি জাহাজ মিলেই এই অ্যাসোসিয়েশন বা ‘আজব রাষ্ট্রটি’ গঠন করা হয়েছিল। তাই বলা হয়-মোট জাহাজ ছিল ১৫ টি, কিন্তু অ্যাসোসিয়েশনের অংশ ছিল ১৪ টি।
শীতল যুদ্ধের (Cold War) চরম উত্তেজনার সময়েও মার্কিন, ব্রিটিশ ও সোভিয়েত ব্লকের (পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া) নাবিকেরা সমস্ত রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে পরম বন্ধুর মতো একসাথে বসবাস শুরু করেন। অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পর প্রতিটি জাহাজকে নির্দিষ্ট সামাজিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতো কাজ করত। বুলগেরিয়ার জাহাজ ‘ভাসিল লেভস্কি’ রূপান্তরিত হয়েছিল সিনেমা হলে। সেখানে নিয়মিত মুভি নাইট হতো। সুইডিশ জাহাজ ‘কিলারা’ তে ছিল সুইমিং পুল, যা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। প্রতি রবিবারে ধর্মীয় প্রার্থনা ও চার্চের কাজ পরিচালিত হতো পশ্চিম জার্মানির জাহাজ ‘নর্ডউইন্ড’-এ।
পোলিশ জাহাজে সার্বক্ষণিক ডাক্তার থাকতেন, যিনি সব জাহাজের ক্রুদের চিকিৎসা দিতেন।
ব্রিটিশ জাহাজ ‘পোর্ট ইনভারকারগিল’ ছিল আকারে সবচেয়ে বড়ো। এর বিশাল ডেকটিকে বানিয়ে ফেলা হয়েছিল একটি ফুটবল মাঠ! সেখানে নিয়মিত আন্তঃজাহাজ ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো।
১৯৬৮ সালে যখন মেক্সিকো সিটিতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক চলছিল, তখন GBLA-এর নাবিকেরা বিটার লেকের বুকেই আয়োজন করেন ‘বিটার লেক মিনি-অলিম্পিক’। লাইফ বোট দিয়ে পাল তোলা নৌকা বাইচ, ডাইভিং, স্প্রিন্ট, হাই জাম্প, আর্চারি এবং ওয়াটার পোলোসহ ১৪ টি ইভেন্টে ৮টি দেশের নাবিকেরা অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় পোল্যান্ড প্রথম, পশ্চিম জার্মানি দ্বিতীয় এবং যুক্তরাজ্য তৃতীয় স্থান অধিকার করে। বিজয়ীদের দেওয়া হয়েছিল হাতে তৈরি মেডেল।
অ্যাসোসিয়েশনের সবচেয়ে বড়ো কীর্তি ছিল তাদের নিজস্ব ডাক ব্যবস্থা। তারা নিজ হাতে রঙ তুলি দিয়ে নকশা করে এক ধরনের বিশেষ ডাকটিকিট (Stamps) তৈরি করত। মজার ব্যাপার হলো, মিশরীয় ডাক কর্তৃপক্ষ এই টিকেটের বৈধতা স্বীকৃতি দিয়েছিল। এই টিকিট লাগানো চিঠিগুলো মিশরের মূল ডাকঘরের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছাত। আজ ফিল্যাটেলিস্টদের (ডাকটিকিট সংগ্রাহক) কাছে এই ‘বিটার লেক লোকাল স্ট্যাম্পস’ অত্যন্ত মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বস্তু।
১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে সুয়েজ খাল পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়। খালের মাইনিং ও ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করার পর, ১৯৭৫ সালের মে মাসে দীর্ঘ ৮ বছর পর সুয়েজ খাল পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়।
এই দীর্ঘ সময়ে মূল নাবিকদের অনেকেই প্রতি ৩-৬ মাস পর পর রোটেশনের মাধ্যমে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩,০০০ নাবিক এই দীর্ঘ সময়ে এখানে দায়িত্ব পালন করেন। তবে, ৮ বছর পর যখন চলাচলের অনুমতি মেলে, তখন ১৪ টি জাহাজের মধ্যে কেবল দুটি জার্মানি জাহাজ-‘মুনস্টারল্যান্ড’ এবং ‘নর্ডউইন্ড’ নিজেদের ইঞ্জিনের ক্ষমতায় সচল ছিল। ১৯৭৫ সালের মে মাসে যখন তারা জার্মানির হামবুর্গ বন্দরে পৌঁছায়, তখন ৩০,০০০ মানুষ তাদের বীরোচিত সংবর্ধনা দেয়। বাকি জাহাজগুলোকে টেনে (Towed) নিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ দীর্ঘ স্থবিরতায় সেগুলো অচল হয়ে পড়েছিল।
‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA) এবং ‘দ্য ইয়েলো ফ্লিট’ (The Yellow Fleet) কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এটি বিংশ শতাব্দীর সামুদ্রিক ইতিহাসের অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সুপ্রমাণিত একটি সত্য ঘটনা। বিশ্বের বড়ো বড়ো সংবাদমাধ্যম, ঐতিহাসিক বই এবং ডকুমেন্টারিতে এর সুনির্দিষ্ট সূত্র বা রেফারেন্স রয়েছে।
১. মূলধারার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম (Mainstream Media)
BBC (বিবিসি): বিবিসির বিখ্যাত ইতিহাস ভিত্তিক রেডিও প্রোগ্রাম ‘Witness History’-তে ২০১০ ও পরবর্তী সময়ে এর ওপর বিশেষ পর্ব প্রচারিত হয়, যার নাম ছিল “The Yellow Fleet”। এতে আটকে পড়া ব্রিটিশ জাহাজের একজন মেম্বার (Phil Saul) নিজেই সেই সময়ে তাদের জীবনযাত্রার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
Al Jazeera (আল জাজিরা): আল জাজিরা ওয়ার্ল্ড এই ঘটনার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ৪৭ মিনিটের দীর্ঘ ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে, যার শিরোনাম : “Suez: The Yellow Fleet trapped by the 1967 Arab-Israeli War”। এখানে তৎকালীন নাবিকদের সাক্ষাৎকার এবং আসল ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছে।
Time Magazine (টাইম ম্যাগাজিন): ১৯৬৯ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় সুয়েজ খালের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রকাশিত বিশেষ ফিচারে এই আটকে পড়া হলুদ নৌবহর এবং তাদের অ্যাসোসিয়েশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল (“World: The Suez Canal’s Bleak Centennial”)।
২. বিশ্ববিখ্যাত ম্যাগাজিন ও প্রকাশনা।
National Geographic (ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক): ১৯৭৫ সালের জুন মাসে, অর্থাৎ সুয়েজ খাল পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাস পর, বিখ্যাত এই ম্যাগাজিনে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জনথান ব্লেয়ারের লেখা সেই আর্টিকেলের নাম ছিল “New Life for the Troubled Suez Canal”।
Popular Mechanics (পপুলার মেকানিক্স): ১৯৭৫ সালের মে সংখ্যায় (“A ‘new’ Suez Canal shapes up for 1980s”) জাহাজগুলোর প্রযুক্তিগত অবস্থা এবং কীভাবে দুটি জার্মান জাহাজ নিজেদের ইঞ্জিনে ফেরত যেতে পেরেছিল, তার নিখুঁত বিবরণ রয়েছে।
৩. একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জার্নাল
IMarEST (Institute of Marine Engineering, Science and Technology): সামুদ্রিক প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের এই আন্তর্জাতিক মর্যাদাশীল প্রতিষ্ঠান তাদের দাপ্তরিক আর্কাইভে “The Suez Great Bitter Lake saga” শিরোনামে একটি ঐতিহাসিক কেস স্টাডি প্রকাশ করেছে। যেখানে অলিম্পিক এবং ডাক ব্যবস্থার বিবরণ রয়েছে।
Journal of Foreign Affairs at Carolina: এই বৈশ্বিক রাজনৈতিক জার্নালে সুয়েজ খালের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝাতে “The Yellow Fleet and Trouble in the Suez” নামে একটি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে।
৪. ডাকটিকিট ও চিঠিপত্রের ঐতিহাসিক দলিল (Philatelic References)
Ships on Stamps / Maritime Topics: আন্তর্জাতিক ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের অফিসিয়াল সাইটগুলোতে (যেমন : shipsonstamps.org) “Great Bitter Lake Locals” নামে একটি বিশাল আর্কাইভ আছে। সেখানে নাবিকদের হাতে তৈরি করা ‘লোকাল স্ট্যাম্পস’ এবং খামের আসল ছবি ও ক্যাটালগ নম্বর সংরক্ষিত আছে।
৫. উইকিপিডিয়া লিংক (En.Wikipedia)।
উইকিপিডিয়াতে “Yellow Fleet” নামে সার্চ করলে এই ঘটনার ওপর একটি বিশাল উইকিপিডিয়া আর্টিকেল পওয়া যায়, যেখানে ৮টি দেশের ১৫টি জাহাজের নাম, তাদের ক্যাপ্টেনের নাম এবং তারা কী মালামাল (যেমন : চকলেট, খেলনা, গরুর চামড়া, ফল ইত্যাদি) বহন করছিল তার সম্পূর্ণ তালিকা এবং রেফারেন্স দেওয়া আছে।
উপসংহার : গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন প্রমাণ করেছিল যে, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং রাজনৈতিক বৈরিতার ঊর্ধ্বে উঠেও মানুষ চাইলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে এক টুকরো স্বর্গ তৈরি করতে পারে। সুয়েজ খালের ইতিহাসে এই ঘটনাটি চিরকাল এক অনন্য ও উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আরোও পড়ুন – ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে তুরস্কের সামরিক অভিযান: দ্বীপ বিভক্তির ইতিহাস
অচল জাহাজের সচল গল্প: ইতিহাসের পাতায় সুয়েজের সেই ‘হলুদ নৌবহর’
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টারঃ
ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব, রোমাঞ্চকর এবং মানবিক ঐক্যের অনন্য দলিল হলো ‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (Great Bitter Lake Association বা GBLA)। এটি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক বা পেশাদার সংগঠন ছিল না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়া ৮টি ভিন্ন দেশের ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের তৈরি করা একটি অনন্য ‘স্বঘোষিত রাষ্ট্র’ বা ক্ষুদ্র সমাজ।
ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বৈরিতা মানুষকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সুয়েজ খালে ঘটেছিল সম্পূর্ণ উলটো এক ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রের ঠিক মাঝখানে আটকা পড়েছিল ৮টি দেশের ১৪টি পণ্যবাহী জাহাজ। দীর্ঘ ৮ বছর (১৯৬৭-১৯৭৫) এক জায়গায় অবরুদ্ধ থাকার পর, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা দূর করতে নাবিকেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন এক অভূতপূর্ব জোট, যার নাম ‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA)। মরুভূমির ধূলিকণায় জাহাজগুলোর রং কালচে-হলুদ হয়ে যাওয়ায় ইতিহাসে এই জাহাজগুলোকে একসাথে ‘দ্য ইয়েলো ফ্লিট’ (The Yellow Fleet) বা হলুদ নৌবহর বলা হয়।
১৯৬৭ সালের ৫ জুন ইসরায়েল এবং আরব দেশগুলোর (মিশর, সিরিয়া, জর্ডান) মধ্যে বিখ্যাত ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ (Six-Day War) শুরু হয়। সেই মুহূর্তে সুয়েজ খাল দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছিল ১৪টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ। যুদ্ধ শুরু হতেই, মিশরীয় কর্তৃপক্ষ সুয়েজ খালের দুই প্রান্তেই নিজেদের যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য নৌযান ডুবিয়ে এবং মাইন পেতে খালের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
ফলে জাহাজগুলোর সামনে বা পেছনে যাওয়ার কোনো পথ খোলা ছিল না। বাধ্য হয়ে জাহাজগুলো সুয়েজ খালের সবচেয়ে প্রশস্ত অংশ-‘গ্রেট বিটার লেক’-এ নোঙর করে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল যুদ্ধ শেষ হলে খোলসা হবে পথ, কিন্তু মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের ইজরায়েলকে সুয়েজ খাল ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় এই অবরোধ দীর্ঘ ৮ বছর স্থায়ী হয়।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও খালের অবরোধ কাটছিল না। মাসের পর মাস সাগরের মাঝে অলস বসে থাকায় নাবিকদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও একাকিত্ব ভর করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে ব্রিটিশ জাহাজ ‘মেলাম্পাস’ (MS Melampus)-এর ওপর সব জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদল একটি সভায় মিলিত হন। সেখানেই জন্ম নেয় ‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA)।
এই অ্যাসোসিয়েশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব এবং বন্দি জীবনকে আনন্দময় করে তোলা। জাহাজগুলোর মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আন্তর্জাতিক বৈচিত্র। জাহাজ গুলোর মধ্য ছিল, যুক্তরাজ্য (৪ টি জাহাজ), পশ্চিম জার্মানি (২ টি জাহাজ), পোল্যান্ড (২ টি জাহাজ), যুক্তরাষ্ট্র (২ টি জাহাজ), সুইডেন (২ টি জাহাজ), ফ্রান্স, বুলগেরিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া (১ টি করে জাহাজ)। দ্য ইয়েলো ফ্লিট (The Yellow Fleet): সুয়েজ খালে আটকে পড়া সমস্ত জাহাজকে একসাথে ‘হলুদ নৌবহর’ বলা হয়, যার সংখ্যা ছিল ১৫ টি (১৪ টি গ্রেট বিটার লেকে, ১ টি লেক তিমসাহ-তে)।
গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন (GBLA), এটি ছিল একটি সামাজিক সংগঠন। যেহেতু SS Observer ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে গ্রেট বিটার লেকের ফুটবল ম্যাচ, সিনেমা হল বা অলিম্পিকে অংশ নিতে পারত না, তাই সে এই অ্যাসোসিয়েশনের অফিশিয়াল মেম্বার হতে পারেনি। কেবল গ্রেট বিটার লেকে থাকা ১৪টি জাহাজ মিলেই এই অ্যাসোসিয়েশন বা ‘আজব রাষ্ট্রটি’ গঠন করা হয়েছিল। তাই বলা হয়-মোট জাহাজ ছিল ১৫ টি, কিন্তু অ্যাসোসিয়েশনের অংশ ছিল ১৪ টি।
শীতল যুদ্ধের (Cold War) চরম উত্তেজনার সময়েও মার্কিন, ব্রিটিশ ও সোভিয়েত ব্লকের (পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া) নাবিকেরা সমস্ত রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে পরম বন্ধুর মতো একসাথে বসবাস শুরু করেন। অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পর প্রতিটি জাহাজকে নির্দিষ্ট সামাজিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতো কাজ করত। বুলগেরিয়ার জাহাজ ‘ভাসিল লেভস্কি’ রূপান্তরিত হয়েছিল সিনেমা হলে। সেখানে নিয়মিত মুভি নাইট হতো। সুইডিশ জাহাজ ‘কিলারা’ তে ছিল সুইমিং পুল, যা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। প্রতি রবিবারে ধর্মীয় প্রার্থনা ও চার্চের কাজ পরিচালিত হতো পশ্চিম জার্মানির জাহাজ ‘নর্ডউইন্ড’-এ।
পোলিশ জাহাজে সার্বক্ষণিক ডাক্তার থাকতেন, যিনি সব জাহাজের ক্রুদের চিকিৎসা দিতেন।
ব্রিটিশ জাহাজ ‘পোর্ট ইনভারকারগিল’ ছিল আকারে সবচেয়ে বড়ো। এর বিশাল ডেকটিকে বানিয়ে ফেলা হয়েছিল একটি ফুটবল মাঠ! সেখানে নিয়মিত আন্তঃজাহাজ ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো।
১৯৬৮ সালে যখন মেক্সিকো সিটিতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক চলছিল, তখন GBLA-এর নাবিকেরা বিটার লেকের বুকেই আয়োজন করেন ‘বিটার লেক মিনি-অলিম্পিক’। লাইফ বোট দিয়ে পাল তোলা নৌকা বাইচ, ডাইভিং, স্প্রিন্ট, হাই জাম্প, আর্চারি এবং ওয়াটার পোলোসহ ১৪ টি ইভেন্টে ৮টি দেশের নাবিকেরা অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় পোল্যান্ড প্রথম, পশ্চিম জার্মানি দ্বিতীয় এবং যুক্তরাজ্য তৃতীয় স্থান অধিকার করে। বিজয়ীদের দেওয়া হয়েছিল হাতে তৈরি মেডেল।
অ্যাসোসিয়েশনের সবচেয়ে বড়ো কীর্তি ছিল তাদের নিজস্ব ডাক ব্যবস্থা। তারা নিজ হাতে রঙ তুলি দিয়ে নকশা করে এক ধরনের বিশেষ ডাকটিকিট (Stamps) তৈরি করত। মজার ব্যাপার হলো, মিশরীয় ডাক কর্তৃপক্ষ এই টিকেটের বৈধতা স্বীকৃতি দিয়েছিল। এই টিকিট লাগানো চিঠিগুলো মিশরের মূল ডাকঘরের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছাত। আজ ফিল্যাটেলিস্টদের (ডাকটিকিট সংগ্রাহক) কাছে এই ‘বিটার লেক লোকাল স্ট্যাম্পস’ অত্যন্ত মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বস্তু।
১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে সুয়েজ খাল পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়। খালের মাইনিং ও ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করার পর, ১৯৭৫ সালের মে মাসে দীর্ঘ ৮ বছর পর সুয়েজ খাল পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়।
এই দীর্ঘ সময়ে মূল নাবিকদের অনেকেই প্রতি ৩-৬ মাস পর পর রোটেশনের মাধ্যমে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩,০০০ নাবিক এই দীর্ঘ সময়ে এখানে দায়িত্ব পালন করেন। তবে, ৮ বছর পর যখন চলাচলের অনুমতি মেলে, তখন ১৪ টি জাহাজের মধ্যে কেবল দুটি জার্মানি জাহাজ-‘মুনস্টারল্যান্ড’ এবং ‘নর্ডউইন্ড’ নিজেদের ইঞ্জিনের ক্ষমতায় সচল ছিল। ১৯৭৫ সালের মে মাসে যখন তারা জার্মানির হামবুর্গ বন্দরে পৌঁছায়, তখন ৩০,০০০ মানুষ তাদের বীরোচিত সংবর্ধনা দেয়। বাকি জাহাজগুলোকে টেনে (Towed) নিয়ে যেতে হয়েছিল, কারণ দীর্ঘ স্থবিরতায় সেগুলো অচল হয়ে পড়েছিল।
‘গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন’ (GBLA) এবং ‘দ্য ইয়েলো ফ্লিট’ (The Yellow Fleet) কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এটি বিংশ শতাব্দীর সামুদ্রিক ইতিহাসের অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সুপ্রমাণিত একটি সত্য ঘটনা। বিশ্বের বড়ো বড়ো সংবাদমাধ্যম, ঐতিহাসিক বই এবং ডকুমেন্টারিতে এর সুনির্দিষ্ট সূত্র বা রেফারেন্স রয়েছে।
১. মূলধারার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম (Mainstream Media)
BBC (বিবিসি): বিবিসির বিখ্যাত ইতিহাস ভিত্তিক রেডিও প্রোগ্রাম ‘Witness History’-তে ২০১০ ও পরবর্তী সময়ে এর ওপর বিশেষ পর্ব প্রচারিত হয়, যার নাম ছিল “The Yellow Fleet”। এতে আটকে পড়া ব্রিটিশ জাহাজের একজন মেম্বার (Phil Saul) নিজেই সেই সময়ে তাদের জীবনযাত্রার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
Al Jazeera (আল জাজিরা): আল জাজিরা ওয়ার্ল্ড এই ঘটনার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ৪৭ মিনিটের দীর্ঘ ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে, যার শিরোনাম : “Suez: The Yellow Fleet trapped by the 1967 Arab-Israeli War”। এখানে তৎকালীন নাবিকদের সাক্ষাৎকার এবং আসল ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছে।
Time Magazine (টাইম ম্যাগাজিন): ১৯৬৯ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় সুয়েজ খালের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রকাশিত বিশেষ ফিচারে এই আটকে পড়া হলুদ নৌবহর এবং তাদের অ্যাসোসিয়েশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল (“World: The Suez Canal’s Bleak Centennial”)।
২. বিশ্ববিখ্যাত ম্যাগাজিন ও প্রকাশনা।
National Geographic (ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক): ১৯৭৫ সালের জুন মাসে, অর্থাৎ সুয়েজ খাল পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক এক মাস পর, বিখ্যাত এই ম্যাগাজিনে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জনথান ব্লেয়ারের লেখা সেই আর্টিকেলের নাম ছিল “New Life for the Troubled Suez Canal”।
Popular Mechanics (পপুলার মেকানিক্স): ১৯৭৫ সালের মে সংখ্যায় (“A ‘new’ Suez Canal shapes up for 1980s”) জাহাজগুলোর প্রযুক্তিগত অবস্থা এবং কীভাবে দুটি জার্মান জাহাজ নিজেদের ইঞ্জিনে ফেরত যেতে পেরেছিল, তার নিখুঁত বিবরণ রয়েছে।
৩. একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জার্নাল
IMarEST (Institute of Marine Engineering, Science and Technology): সামুদ্রিক প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের এই আন্তর্জাতিক মর্যাদাশীল প্রতিষ্ঠান তাদের দাপ্তরিক আর্কাইভে “The Suez Great Bitter Lake saga” শিরোনামে একটি ঐতিহাসিক কেস স্টাডি প্রকাশ করেছে। যেখানে অলিম্পিক এবং ডাক ব্যবস্থার বিবরণ রয়েছে।
Journal of Foreign Affairs at Carolina: এই বৈশ্বিক রাজনৈতিক জার্নালে সুয়েজ খালের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝাতে “The Yellow Fleet and Trouble in the Suez” নামে একটি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে।
৪. ডাকটিকিট ও চিঠিপত্রের ঐতিহাসিক দলিল (Philatelic References)
Ships on Stamps / Maritime Topics: আন্তর্জাতিক ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের অফিসিয়াল সাইটগুলোতে (যেমন : shipsonstamps.org) “Great Bitter Lake Locals” নামে একটি বিশাল আর্কাইভ আছে। সেখানে নাবিকদের হাতে তৈরি করা ‘লোকাল স্ট্যাম্পস’ এবং খামের আসল ছবি ও ক্যাটালগ নম্বর সংরক্ষিত আছে।
৫. উইকিপিডিয়া লিংক (En.Wikipedia)।
উইকিপিডিয়াতে “Yellow Fleet” নামে সার্চ করলে এই ঘটনার ওপর একটি বিশাল উইকিপিডিয়া আর্টিকেল পওয়া যায়, যেখানে ৮টি দেশের ১৫টি জাহাজের নাম, তাদের ক্যাপ্টেনের নাম এবং তারা কী মালামাল (যেমন : চকলেট, খেলনা, গরুর চামড়া, ফল ইত্যাদি) বহন করছিল তার সম্পূর্ণ তালিকা এবং রেফারেন্স দেওয়া আছে।
উপসংহার : গ্রেট বিটার লেক অ্যাসোসিয়েশন প্রমাণ করেছিল যে, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং রাজনৈতিক বৈরিতার ঊর্ধ্বে উঠেও মানুষ চাইলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে এক টুকরো স্বর্গ তৈরি করতে পারে। সুয়েজ খালের ইতিহাসে এই ঘটনাটি চিরকাল এক অনন্য ও উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আরোও পড়ুন – ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে তুরস্কের সামরিক অভিযান: দ্বীপ বিভক্তির ইতিহাস