জীর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান, সংকটে জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকার দোহার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘ ৮৯ বছরের ইতিহাস বয়ে চললেও বর্তমানে নানা সংকটে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি একসময় এলাকার শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। শিক্ষার্থীদের কোলাহল, ভালো ফলাফল এবং বৃত্তি অর্জনের গৌরব ছিল বিদ্যালয়টির বড় পরিচয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়া, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি এখন ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার ও উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনের অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২০০১ সালে নির্মিত ভবনের বিভিন্ন অংশের প্লাস্টার খসে পড়েছে এবং ছাদের কংক্রিট উঠে গিয়ে মরিচা ধরা রড বের হয়ে আছে। কাঠের দরজা-জানালাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। ভবনের দুটি শ্রেণিকক্ষ এখন ব্যবহার অনুপযোগী। তবুও কক্ষ সংকটের কারণে একটি কক্ষে অফিস কার্যক্রম এবং অন্য কক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। স্থানীয় অভিভাবকরা বলছেন, যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান চলায় উদ্বেগ বাড়ছে জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘিরে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রওশনারা বেগম জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট ১২৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ১৮ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১১ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৩ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৩৩ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে রয়েছে ১৪ জন শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আগে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক অভিভাবক সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, শ্রেণিকক্ষ সংকট এবং যাতায়াত ব্যবস্থার দুরবস্থার কথা উল্লেখ করছেন।

স্থানীয়দের মতে, একসময় এলাকার শিক্ষার গর্ব ছিল জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১০ সালেও এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা বৃত্তি অর্জন করে সুনাম কুড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যালয়টির পরিবেশ আগের মতো নেই। স্থানীয় বাসিন্দা লিপন খান বলেন, “বিদ্যালয়টিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত বহুতল আধুনিক ভবন নির্মাণ জরুরি।” আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ জামাল বলেন, বিদ্যালয়ের রাস্তা সংস্কার ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী আরও কমে যাবে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে একটি চার সদস্যবিশিষ্ট এডহক কমিটি দায়িত্ব পালন করছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আসছে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রধান শিক্ষিকা জানান, দ্রুত নতুন ম্যানেজিং কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সক্রিয় কমিটি গঠন হলে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সহজ হবে।

দোহার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: নায়েব আলী বলেন, গত ২ মে তিনি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন এবং ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ডকুমেন্ট পাঠানো হয়েছে। দ্রুত অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ এবং ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আবারও আগের ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আবারও শিক্ষার আলো ছড়াতে সক্ষম হবে।

আরোও পড়ুন – দোহারে খাল খনন উদ্বোধন, আবু আশফাকের ঐতিহাসিক মন্তব্য

জীর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান, সংকটে জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

মে ১০, ২০২৬

শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকার দোহার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘ ৮৯ বছরের ইতিহাস বয়ে চললেও বর্তমানে নানা সংকটে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি একসময় এলাকার শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। শিক্ষার্থীদের কোলাহল, ভালো ফলাফল এবং বৃত্তি অর্জনের গৌরব ছিল বিদ্যালয়টির বড় পরিচয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়া, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি এখন ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার ও উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনের অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২০০১ সালে নির্মিত ভবনের বিভিন্ন অংশের প্লাস্টার খসে পড়েছে এবং ছাদের কংক্রিট উঠে গিয়ে মরিচা ধরা রড বের হয়ে আছে। কাঠের দরজা-জানালাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। ভবনের দুটি শ্রেণিকক্ষ এখন ব্যবহার অনুপযোগী। তবুও কক্ষ সংকটের কারণে একটি কক্ষে অফিস কার্যক্রম এবং অন্য কক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। স্থানীয় অভিভাবকরা বলছেন, যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান চলায় উদ্বেগ বাড়ছে জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘিরে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রওশনারা বেগম জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট ১২৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ১৮ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১১ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৩ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৩৩ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে রয়েছে ১৪ জন শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আগে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক অভিভাবক সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, শ্রেণিকক্ষ সংকট এবং যাতায়াত ব্যবস্থার দুরবস্থার কথা উল্লেখ করছেন।

স্থানীয়দের মতে, একসময় এলাকার শিক্ষার গর্ব ছিল জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১০ সালেও এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা বৃত্তি অর্জন করে সুনাম কুড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যালয়টির পরিবেশ আগের মতো নেই। স্থানীয় বাসিন্দা লিপন খান বলেন, “বিদ্যালয়টিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত বহুতল আধুনিক ভবন নির্মাণ জরুরি।” আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ জামাল বলেন, বিদ্যালয়ের রাস্তা সংস্কার ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী আরও কমে যাবে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে একটি চার সদস্যবিশিষ্ট এডহক কমিটি দায়িত্ব পালন করছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আসছে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রধান শিক্ষিকা জানান, দ্রুত নতুন ম্যানেজিং কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সক্রিয় কমিটি গঠন হলে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সহজ হবে।

দোহার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: নায়েব আলী বলেন, গত ২ মে তিনি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন এবং ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ডকুমেন্ট পাঠানো হয়েছে। দ্রুত অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ এবং ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আবারও আগের ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আবারও শিক্ষার আলো ছড়াতে সক্ষম হবে।

আরোও পড়ুন – দোহারে খাল খনন উদ্বোধন, আবু আশফাকের ঐতিহাসিক মন্তব্য