মো: ইলিয়াস চৌধুরী, কালিয়াকৈর প্রতিনিধিঃ
গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভায় টানা চার দিনের জলাবদ্ধতা শেষে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন। তবে পানি সরে গেলেও দৃশ্যমান হয়েছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা শুধু কয়েকটি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেই স্থবির করেনি, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক কলোনি ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এবারের জলাবদ্ধতায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যা সামাল দিতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে সরেজমিনে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিশ্বাসপাড়া, হরিণহাটি, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকা এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ডাইনকিনি ও হরতকিতলা এলাকায় ঘুরে দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। গত ১৭ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত টানা জলাবদ্ধতায় এসব এলাকার হাজারো মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। অনেক পরিবারকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। পানি নামলেও ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার লড়াই শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এত ভয়াবহ কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা আর দেখা যায়নি।
হরিণহাটি এলাকায় অবস্থিত ‘আমার দোকান’ নামে একটি সুপার শপে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের বিক্রয়কেন্দ্র ও স্টোরে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ পণ্য পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মাসুদুর রহমান জানান, প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই এলাকায় মুদি ব্যবসায়ী কবির মিয়া জানান, তিনি বিক্রির জন্য দুই লাখ টাকার চাল দোকানে তুলেছিলেন। কিন্তু রাতের বৃষ্টির পর ভোরে দোকান পানিতে তলিয়ে গেলে সব চাল ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এনজিও ঋণের অর্থ দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখন তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
বিশ্বাসপাড়া এলাকার মুদি দোকান ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদ মিয়ার প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, পানি এত দ্রুত বেড়েছিল যে দোকান থেকে কিছু সরানোর সুযোগই পাননি। একই এলাকার বাসিন্দা আফসানা খাতুন জানান, তার মালিকানাধীন টিনশেড আবাসিক কলোনির ১৯টি কক্ষ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে ভাড়াটিয়ারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যেতে বাধ্য হন। চার দিন পর পানি কমলেও অনেকেই এখনো ফিরে আসেননি। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন তিনি।
চাকরিজীবী মো. মিজানুর রহমান বলেন, রাতে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন ঘরের ভেতর কোমরসমান পানি। তড়িঘড়ি করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেও ঘরের কোনো জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে পারেননি। পরে পানি নেমে গেলে তিনি দেখতে পান ফ্রিজ, টেলিভিশন, আসবাবপত্রসহ প্রায় সব মূল্যবান সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি বলে জানান তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও খাল-নালা দখল হয়ে যাওয়ার কারণেই কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বেপারি বলেন, জীবনে অনেক বন্যা দেখেছেন, কিন্তু নিজ এলাকায় এমন পরিস্থিতি কখনো দেখেননি। তার মতে, এ দুর্ভোগ মানুষকে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। ব্যবসা ও সম্পদের ক্ষতির চেয়েও পরিবারকে নিরাপদে রাখতে পারাই বড় সান্ত্বনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্থানীয়রা মনে করছেন, দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
কালিয়াকৈর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুল আলম তালুকদার বলেন, আকস্মিকভাবে এত পানি জমে যাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনও বিস্মিত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নালা ও খাল ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ হয়ে থাকায় পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। ইতোমধ্যে সেসব পরিষ্কার করা হয়েছে এবং পানি পুরোপুরি নেমে গেছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা রোধে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ সত্যিই উদ্বেগজনক। প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যাতে না হয় সেজন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন দ্রুত পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন, যাতে আগামী বর্ষায় আর কোনো পরিবারকে এমন দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে না হয়।
আরোও পড়ুন – মাদককে ‘না’ বলে কাচারীঘাট বাজারে সিসি ক্যামেরা বিতরণ
৪ দিনের জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত কালিয়াকৈর পৌর এলাকা, কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি
মো: ইলিয়াস চৌধুরী, কালিয়াকৈর প্রতিনিধিঃ
গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভায় টানা চার দিনের জলাবদ্ধতা শেষে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন। তবে পানি সরে গেলেও দৃশ্যমান হয়েছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা শুধু কয়েকটি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেই স্থবির করেনি, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক কলোনি ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এবারের জলাবদ্ধতায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যা সামাল দিতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে সরেজমিনে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিশ্বাসপাড়া, হরিণহাটি, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকা এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ডাইনকিনি ও হরতকিতলা এলাকায় ঘুরে দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। গত ১৭ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত টানা জলাবদ্ধতায় এসব এলাকার হাজারো মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। অনেক পরিবারকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। পানি নামলেও ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার লড়াই শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এত ভয়াবহ কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা আর দেখা যায়নি।
হরিণহাটি এলাকায় অবস্থিত ‘আমার দোকান’ নামে একটি সুপার শপে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের বিক্রয়কেন্দ্র ও স্টোরে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ পণ্য পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মাসুদুর রহমান জানান, প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই এলাকায় মুদি ব্যবসায়ী কবির মিয়া জানান, তিনি বিক্রির জন্য দুই লাখ টাকার চাল দোকানে তুলেছিলেন। কিন্তু রাতের বৃষ্টির পর ভোরে দোকান পানিতে তলিয়ে গেলে সব চাল ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এনজিও ঋণের অর্থ দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখন তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
বিশ্বাসপাড়া এলাকার মুদি দোকান ব্যবসায়ী আব্দুস সামাদ মিয়ার প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, পানি এত দ্রুত বেড়েছিল যে দোকান থেকে কিছু সরানোর সুযোগই পাননি। একই এলাকার বাসিন্দা আফসানা খাতুন জানান, তার মালিকানাধীন টিনশেড আবাসিক কলোনির ১৯টি কক্ষ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে ভাড়াটিয়ারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যেতে বাধ্য হন। চার দিন পর পানি কমলেও অনেকেই এখনো ফিরে আসেননি। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন তিনি।
চাকরিজীবী মো. মিজানুর রহমান বলেন, রাতে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন ঘরের ভেতর কোমরসমান পানি। তড়িঘড়ি করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেও ঘরের কোনো জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে পারেননি। পরে পানি নেমে গেলে তিনি দেখতে পান ফ্রিজ, টেলিভিশন, আসবাবপত্রসহ প্রায় সব মূল্যবান সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি বলে জানান তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও খাল-নালা দখল হয়ে যাওয়ার কারণেই কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বেপারি বলেন, জীবনে অনেক বন্যা দেখেছেন, কিন্তু নিজ এলাকায় এমন পরিস্থিতি কখনো দেখেননি। তার মতে, এ দুর্ভোগ মানুষকে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। ব্যবসা ও সম্পদের ক্ষতির চেয়েও পরিবারকে নিরাপদে রাখতে পারাই বড় সান্ত্বনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্থানীয়রা মনে করছেন, দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
কালিয়াকৈর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুল আলম তালুকদার বলেন, আকস্মিকভাবে এত পানি জমে যাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনও বিস্মিত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নালা ও খাল ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ হয়ে থাকায় পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। ইতোমধ্যে সেসব পরিষ্কার করা হয়েছে এবং পানি পুরোপুরি নেমে গেছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে কালিয়াকৈর জলাবদ্ধতা রোধে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ সত্যিই উদ্বেগজনক। প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যাতে না হয় সেজন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন দ্রুত পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন, যাতে আগামী বর্ষায় আর কোনো পরিবারকে এমন দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে না হয়।
আরোও পড়ুন – মাদককে ‘না’ বলে কাচারীঘাট বাজারে সিসি ক্যামেরা বিতরণ