নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, Global South-এর প্রতিনিধিত্ব ও বহুমেরু বিশ্বের চাপে ১৯৪৫-এর কাঠামো কতটা কার্যকর—নিউইয়র্কে সামনে নতুন প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদারঃ
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কে শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিত্ব, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। ফলে যুদ্ধ, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এই সময়ে সংস্থাটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মূল প্রশ্নটি এখন শুধু নিরাপত্তা পরিষদে আরও সদস্য যোগ হবে কি না—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ১৯৪৫ সালের ক্ষমতার ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে তৈরি বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের ক্রমবর্ধমান বহুমেরু বিশ্বকে কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এখনো ভেটো ক্ষমতা ধরে রেখেছে। অন্যদিকে আফ্রিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ মনে করে, বর্তমান প্রতিনিধিত্ব বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটায় না।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এ ব্যবধানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৩৯তম সম্মেলনে তিনি আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টিকে ‘indefensible’ বা অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, “This is 2026 — not 1946.” একই সঙ্গে তিনি বলেন, আফ্রিকা ও বিশ্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আফ্রিকার কণ্ঠও সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে থাকা প্রয়োজন।
এই বক্তব্য শুধু আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তখনকার শক্তির ভারসাম্য আজ আর একই নেই। এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান, আফ্রিকার জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক প্রভাব এবং Global South-এর সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রত্যেকের একটি করে ভোট থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থায়ী সদস্যদের ভেটো বড় ধরনের প্রভাব রাখে।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আলোচনা ইতোমধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। ২০২৬ সালেও এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সংস্কারের পক্ষে থাকা দেশগুলো সাধারণত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো, অঞ্চলভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব উন্নত করা এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে কোন দেশ বা অঞ্চল কতটি আসন পাবে, নতুন সদস্যরা স্থায়ী হবে কি না এবং ভেটো ক্ষমতার পরিধি কী হবে—এসব প্রশ্নে মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা।
এখানেই সংস্কারের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক দিকটি সামনে আসে। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ বাড়ানো হলে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আবার বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকের নিজস্ব কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ফলে নীতিগতভাবে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হলেও বাস্তবে একটি সর্বসম্মত সমাধানে পৌঁছানো সহজ নয়। এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো বদলানোর প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও প্রভাবের হিসাব।
২০২৬ সালের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিও বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। জাতিসংঘের provisional schedule অনুযায়ী, সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একই সময়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি প্রস্তুতি এবং পারমাণবিক অস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংকটের পরিধি এখন এত বিস্তৃত যে কোনো একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা বা যুদ্ধের বাইরে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Global South-এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এ আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। অর্থনৈতিক শক্তির বিস্তার, আঞ্চলিক জোটের সক্রিয়তা এবং বহুমেরু রাজনীতির প্রসারের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি অংশীদারিত্ব চাইছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতিও বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণকে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক আলোচনায় Global South-এর প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যেও বর্তমান সময়কে জাতিসংঘের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা শুধু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নয়, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। কোনো যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট বা জলবায়ুজনিত দুর্যোগে নিরাপত্তা পরিষদ দ্রুত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে না পারলে সাধারণ মানুষের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, শান্তিরক্ষা, বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক অচলাবস্থার পরোক্ষ প্রভাব তৈরি হতে পারে। ফলে সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল কূটনীতিকদের বৈঠকের বিষয় নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জাতিসংঘের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই কার্যকর হয়, যখন সদস্যরা মনে করেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ন্যায্য, প্রতিনিধিত্বশীল এবং বাস্তবসম্মত। কোনো অঞ্চল যদি দীর্ঘদিন ধরে মনে করে যে তার রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্বের তুলনায় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কণ্ঠ দুর্বল, তাহলে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমতে পারে। এই কারণেই নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আলোচনা শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে।
মহাসচিব গুতেরেসের বক্তব্যে সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ২১ শতকের বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হলে শুধু নিরাপত্তা পরিষদ নয়, বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়েও ভাবতে হবে। আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে তিনি এ বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন।
তবে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। কারণ জাতিসংঘ সনদের কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী সদস্যপদ ও ভেটোর মতো মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনতে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমর্থনের পাশাপাশি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিও প্রয়োজন। তাই আগামী দিনের আলোচনা যতটা নীতিগত, ততটাই কৌশলগত। কে কতটা ক্ষমতা ছাড়বে এবং কে কতটা নতুন ক্ষমতা পাবে—এই হিসাবই সংস্কারের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়, বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো কি সময়ের সঙ্গে বদলাবে, নাকি ১৯৪৫ সালের বাস্তবতার ছায়াতেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হবে? ৮১তম সাধারণ পরিষদের আলোচনায় এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হয়তো মিলবে না। তবে বর্তমান বিশ্ব যে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের সামনে তাই শুধু নতুন সদস্য যোগ করার প্রশ্ন নয়; বরং এমন একটি কাঠামো তৈরির প্রয়োজন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল, অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠীর পরিবর্তিত বাস্তবতা কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হবে। জাতিসংঘ পুরোনো প্রতিষ্ঠান হয়েই নতুন পৃথিবী পরিচালনা করবে, নাকি নিজেকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে রূপান্তর করবে—আগামী দিনের বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার বড় প্রশ্ন সেটিই।
আরোও পড়ুন – বিদেশের কারাগারে ১০ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বন্দি
জাতিসংঘ কি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোয় নতুন পৃথিবী চালাতে পারবে?
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, Global South-এর প্রতিনিধিত্ব ও বহুমেরু বিশ্বের চাপে ১৯৪৫-এর কাঠামো কতটা কার্যকর—নিউইয়র্কে সামনে নতুন প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি, সঞ্জয় মজুমদারঃ
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কে শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিত্ব, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। ফলে যুদ্ধ, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এই সময়ে সংস্থাটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মূল প্রশ্নটি এখন শুধু নিরাপত্তা পরিষদে আরও সদস্য যোগ হবে কি না—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ১৯৪৫ সালের ক্ষমতার ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে তৈরি বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের ক্রমবর্ধমান বহুমেরু বিশ্বকে কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এখনো ভেটো ক্ষমতা ধরে রেখেছে। অন্যদিকে আফ্রিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ মনে করে, বর্তমান প্রতিনিধিত্ব বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটায় না।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এ ব্যবধানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৩৯তম সম্মেলনে তিনি আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টিকে ‘indefensible’ বা অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, “This is 2026 — not 1946.” একই সঙ্গে তিনি বলেন, আফ্রিকা ও বিশ্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আফ্রিকার কণ্ঠও সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে থাকা প্রয়োজন।
এই বক্তব্য শুধু আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তখনকার শক্তির ভারসাম্য আজ আর একই নেই। এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান, আফ্রিকার জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক প্রভাব এবং Global South-এর সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রত্যেকের একটি করে ভোট থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থায়ী সদস্যদের ভেটো বড় ধরনের প্রভাব রাখে।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আলোচনা ইতোমধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। ২০২৬ সালেও এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সংস্কারের পক্ষে থাকা দেশগুলো সাধারণত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানো, অঞ্চলভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব উন্নত করা এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে কোন দেশ বা অঞ্চল কতটি আসন পাবে, নতুন সদস্যরা স্থায়ী হবে কি না এবং ভেটো ক্ষমতার পরিধি কী হবে—এসব প্রশ্নে মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা।
এখানেই সংস্কারের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক দিকটি সামনে আসে। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ বাড়ানো হলে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আবার বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকের নিজস্ব কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ফলে নীতিগতভাবে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হলেও বাস্তবে একটি সর্বসম্মত সমাধানে পৌঁছানো সহজ নয়। এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো বদলানোর প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও প্রভাবের হিসাব।
২০২৬ সালের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিও বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। জাতিসংঘের provisional schedule অনুযায়ী, সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একই সময়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি প্রস্তুতি এবং পারমাণবিক অস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংকটের পরিধি এখন এত বিস্তৃত যে কোনো একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা বা যুদ্ধের বাইরে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Global South-এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এ আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। অর্থনৈতিক শক্তির বিস্তার, আঞ্চলিক জোটের সক্রিয়তা এবং বহুমেরু রাজনীতির প্রসারের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি অংশীদারিত্ব চাইছে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতিও বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণকে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক আলোচনায় Global South-এর প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যেও বর্তমান সময়কে জাতিসংঘের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা শুধু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নয়, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। কোনো যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট বা জলবায়ুজনিত দুর্যোগে নিরাপত্তা পরিষদ দ্রুত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে না পারলে সাধারণ মানুষের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, শান্তিরক্ষা, বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক অচলাবস্থার পরোক্ষ প্রভাব তৈরি হতে পারে। ফলে সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল কূটনীতিকদের বৈঠকের বিষয় নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জাতিসংঘের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই কার্যকর হয়, যখন সদস্যরা মনে করেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ন্যায্য, প্রতিনিধিত্বশীল এবং বাস্তবসম্মত। কোনো অঞ্চল যদি দীর্ঘদিন ধরে মনে করে যে তার রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্বের তুলনায় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কণ্ঠ দুর্বল, তাহলে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমতে পারে। এই কারণেই নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আলোচনা শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে।
মহাসচিব গুতেরেসের বক্তব্যে সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ২১ শতকের বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হলে শুধু নিরাপত্তা পরিষদ নয়, বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়েও ভাবতে হবে। আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে তিনি এ বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন।
তবে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। কারণ জাতিসংঘ সনদের কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী সদস্যপদ ও ভেটোর মতো মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনতে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমর্থনের পাশাপাশি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিও প্রয়োজন। তাই আগামী দিনের আলোচনা যতটা নীতিগত, ততটাই কৌশলগত। কে কতটা ক্ষমতা ছাড়বে এবং কে কতটা নতুন ক্ষমতা পাবে—এই হিসাবই সংস্কারের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়, বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো কি সময়ের সঙ্গে বদলাবে, নাকি ১৯৪৫ সালের বাস্তবতার ছায়াতেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হবে? ৮১তম সাধারণ পরিষদের আলোচনায় এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হয়তো মিলবে না। তবে বর্তমান বিশ্ব যে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের সামনে তাই শুধু নতুন সদস্য যোগ করার প্রশ্ন নয়; বরং এমন একটি কাঠামো তৈরির প্রয়োজন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল, অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠীর পরিবর্তিত বাস্তবতা কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হবে। জাতিসংঘ পুরোনো প্রতিষ্ঠান হয়েই নতুন পৃথিবী পরিচালনা করবে, নাকি নিজেকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে রূপান্তর করবে—আগামী দিনের বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার বড় প্রশ্ন সেটিই।
আরোও পড়ুন – বিদেশের কারাগারে ১০ হাজারের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বন্দি