ডা. শফিউল আলম, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
স্ট্রোক একটি গুরুতর ও জীবনসংকটাপন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা, যা মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে ঘটে। এটি সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী পক্ষাঘাত, কথা বলার ক্ষমতা হারানো, স্মৃতিশক্তির সমস্যা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। তবে সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ রয়েছে, তাদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি। তাই স্ট্রোকের মূল ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রত্যেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি
১. উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির কারণ। দীর্ঘদিন রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সংকুচিত হওয়া কিংবা কোনো ক্ষেত্রে ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার রক্তনালির ভেতরে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ এবং লবণ খাওয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
২. ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের বিভিন্ন রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন ও কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে স্ট্রোকের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। রক্তে অতিরিক্ত শর্করা রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, পরিমিত খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুধু উপসর্গ না থাকলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
৩. উচ্চ কোলেস্টেরল ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেড়ে গেলে ধীরে ধীরে ধমনির ভেতরের দেয়ালে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমতে পারে। এর ফলে রক্তনালি সরু হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছানোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে হৃদ্যন্ত্রের কিছু সমস্যা, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন বা অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দনের কারণে হৃদ্যন্ত্রে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কের রক্তনালিতে পৌঁছে স্ট্রোক ঘটাতে পারে। তাই কোলেস্টেরল পরীক্ষা, হৃদ্যন্ত্রের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ধূমপায়ী ও মাদক গ্রহণকারীরা
ধূমপান রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রক্তচাপ বাড়ায়। সিগারেটের ক্ষতিকর উপাদান রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের ক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ছাড়া কিছু অবৈধ মাদক, বিশেষ করে কোকেন ও অ্যামফেটামিনজাতীয় উত্তেজক পদার্থ রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন হঠাৎ বাড়িয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। শুধু নিজে ধূমপান করাই নয়, অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শেও স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। তাই ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং মাদক থেকে দূরে থাকা সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. স্থূলতা ও শারীরিক পরিশ্রমে অনাগ্রহী ব্যক্তিরা
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা শরীরের বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে স্থূলতার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের সম্পর্ক রয়েছে। যারা দীর্ঘ সময় বসে থাকেন, নিয়মিত হাঁটাচলা করেন না কিংবা শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলেন, তাদের এসব সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটাচলা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা প্রয়োজন। প্রতিদিনের জীবনযাপনে ছোট ছোট পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের সুস্থতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
৬. বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও পূর্ববর্তী স্ট্রোকের রোগীরা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকের আশঙ্কা সাধারণত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে পরিবারের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই যে স্ট্রোক হবেই, এমন নয়। পাশাপাশি আগে স্ট্রোক অথবা ক্ষণস্থায়ী মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের সমস্যা বা টিআইএ (TIA) হয়ে থাকলে পুনরায় স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নির্ধারিত ওষুধ নিয়ম মেনে গ্রহণ করা জরুরি। বয়স কিংবা পারিবারিক ইতিহাস পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকিগুলো কমিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস করা যায়।
৭. অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা
অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত মদ্যপান বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া কিডনির দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো অবস্থাও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সুস্থ থাকতে শুধু একটি রোগ নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; বরং সামগ্রিক জীবনযাত্রার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত বিশ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন
স্ট্রোক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রথমেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং নির্ধারিত ওষুধ নিয়ম মেনে গ্রহণ করা জরুরি। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ও আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হবে। অতিরিক্ত লবণ, চর্বি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে। ধূমপান সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, যেমন দ্রুত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশের হাত বা পা দুর্বল কিংবা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া অথবা কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এ ছাড়া হঠাৎ দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা, ভারসাম্য হারানো, মাথা ঘোরা কিংবা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও সতর্কসংকেত হতে পারে। এসব লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে। লক্ষণ কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে গেলেও অবহেলা করা যাবে না, কারণ এটি সাময়িক রক্তপ্রবাহের সমস্যা বা টিআইএ হতে পারে।
সচেতনতাই হতে পারে স্ট্রোক প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ
স্ট্রোক কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের রোগ নয়; যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ধূমপান, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে সচেতন থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই আগাম সতর্কতা নেওয়া সম্ভব। স্ট্রোকের মূল ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর ঘরোয়া চিকিৎসা কিংবা অপেক্ষা করা বিপজ্জনক। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো রোগীর জীবন রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও এসব বিষয়ে সচেতন করুন।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ: ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগ অনুযায়ী ঝুঁকি ও চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরোও পড়ুন – অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক: উত্তরবঙ্গে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় লালমনিরহাটেও সতর্কতা
স্ট্রোকের মূল ঝুঁকি: যাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি
ডা. শফিউল আলম, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
স্ট্রোক একটি গুরুতর ও জীবনসংকটাপন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা, যা মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে ঘটে। এটি সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে স্থায়ী পক্ষাঘাত, কথা বলার ক্ষমতা হারানো, স্মৃতিশক্তির সমস্যা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। তবে সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ রয়েছে, তাদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি। তাই স্ট্রোকের মূল ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রত্যেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি
১. উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির কারণ। দীর্ঘদিন রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সংকুচিত হওয়া কিংবা কোনো ক্ষেত্রে ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার রক্তনালির ভেতরে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ এবং লবণ খাওয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
২. ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের বিভিন্ন রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন ও কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে স্ট্রোকের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। রক্তে অতিরিক্ত শর্করা রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, পরিমিত খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুধু উপসর্গ না থাকলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
৩. উচ্চ কোলেস্টেরল ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা
রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেড়ে গেলে ধীরে ধীরে ধমনির ভেতরের দেয়ালে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমতে পারে। এর ফলে রক্তনালি সরু হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছানোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে হৃদ্যন্ত্রের কিছু সমস্যা, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন বা অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দনের কারণে হৃদ্যন্ত্রে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কের রক্তনালিতে পৌঁছে স্ট্রোক ঘটাতে পারে। তাই কোলেস্টেরল পরীক্ষা, হৃদ্যন্ত্রের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ধূমপায়ী ও মাদক গ্রহণকারীরা
ধূমপান রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রক্তচাপ বাড়ায়। সিগারেটের ক্ষতিকর উপাদান রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের ক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ছাড়া কিছু অবৈধ মাদক, বিশেষ করে কোকেন ও অ্যামফেটামিনজাতীয় উত্তেজক পদার্থ রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন হঠাৎ বাড়িয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। শুধু নিজে ধূমপান করাই নয়, অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শেও স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। তাই ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং মাদক থেকে দূরে থাকা সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. স্থূলতা ও শারীরিক পরিশ্রমে অনাগ্রহী ব্যক্তিরা
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা শরীরের বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে স্থূলতার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের সম্পর্ক রয়েছে। যারা দীর্ঘ সময় বসে থাকেন, নিয়মিত হাঁটাচলা করেন না কিংবা শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলেন, তাদের এসব সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটাচলা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা প্রয়োজন। প্রতিদিনের জীবনযাপনে ছোট ছোট পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের সুস্থতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
৬. বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও পূর্ববর্তী স্ট্রোকের রোগীরা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকের আশঙ্কা সাধারণত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে পরিবারের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই যে স্ট্রোক হবেই, এমন নয়। পাশাপাশি আগে স্ট্রোক অথবা ক্ষণস্থায়ী মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের সমস্যা বা টিআইএ (TIA) হয়ে থাকলে পুনরায় স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নির্ধারিত ওষুধ নিয়ম মেনে গ্রহণ করা জরুরি। বয়স কিংবা পারিবারিক ইতিহাস পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকিগুলো কমিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস করা যায়।
৭. অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা
অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত মদ্যপান বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া কিডনির দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো অবস্থাও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সুস্থ থাকতে শুধু একটি রোগ নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; বরং সামগ্রিক জীবনযাত্রার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত বিশ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন
স্ট্রোক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রথমেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং নির্ধারিত ওষুধ নিয়ম মেনে গ্রহণ করা জরুরি। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ও আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হবে। অতিরিক্ত লবণ, চর্বি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হবে। ধূমপান সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, যেমন দ্রুত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশের হাত বা পা দুর্বল কিংবা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া অথবা কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এ ছাড়া হঠাৎ দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা, ভারসাম্য হারানো, মাথা ঘোরা কিংবা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও সতর্কসংকেত হতে পারে। এসব লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে। লক্ষণ কিছুক্ষণ পর ভালো হয়ে গেলেও অবহেলা করা যাবে না, কারণ এটি সাময়িক রক্তপ্রবাহের সমস্যা বা টিআইএ হতে পারে।
সচেতনতাই হতে পারে স্ট্রোক প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ
স্ট্রোক কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের রোগ নয়; যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ধূমপান, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে সচেতন থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই আগাম সতর্কতা নেওয়া সম্ভব। স্ট্রোকের মূল ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর ঘরোয়া চিকিৎসা কিংবা অপেক্ষা করা বিপজ্জনক। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো রোগীর জীবন রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও এসব বিষয়ে সচেতন করুন।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ: ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগ অনুযায়ী ঝুঁকি ও চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরোও পড়ুন – অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক: উত্তরবঙ্গে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় লালমনিরহাটেও সতর্কতা