প্রেমের টানে চীনা যুবক মেহেরপুরে, বিয়ের কাগজে রহস্য ও আইনি প্রশ্ন

এস কে সামিউল ইসলাম, মেহেরপুর প্রতিনিধিঃ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, সেখান থেকে প্রেম, এরপর হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের চীন থেকে বাংলাদেশে আগমন। এমনই আলোচিত ঘটনাকে ঘিরে এখন মেহেরপুরজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। চীনা যুবক ডং জে, যিনি বর্তমানে নিজের নাম মোহাম্মদ আলী বলে পরিচয় দিচ্ছেন, দাবি করেছেন তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মেহেরপুর পৌর এলাকার ঘোষপাড়ার বাসিন্দা শরিফ ড্রাইভারের মেয়ে কেয়া খাতুনকে বৈধভাবে বিয়ে করেছেন। তবে তাদের উপস্থাপিত নথিপত্র, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া যাওয়ায় পুরো ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসন, আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল এবং প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেয়া খাতুনের সঙ্গে ডং জে-এর পরিচয় হয়। দীর্ঘদিন অনলাইনে যোগাযোগের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কেয়া জানান, প্রেমের টানে ডং জে প্রথমবার মেহেরপুরে এসে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে তার সঙ্গে দেখা করেন। পরে তিনি প্রায় ১৭ দিন শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন। এরপর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তারা বিয়ে করেন বলে দাবি করেন। বিয়ের পর দুজন চীনে চলে যান এবং সেখানে প্রায় তিন মাস অবস্থান শেষে সম্প্রতি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তবে চীনা যুবক-এর বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার রাতে কেয়া তার বাবার বাড়িতে ওই বিদেশি নাগরিককে নিয়ে গোপনে আসেন। বিষয়টি জানাজানি হলে আশপাশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয় এবং এলাকায় ভিড় জমে। পরদিন সকালেই তারা সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান। এ সময় সংবাদকর্মী, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কেয়ার বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, তারা মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিসপাড়ার একটি পাঁচতলা ভবনের ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন। সেখানে গিয়ে সংবাদকর্মীরা তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চীনা যুবক ডং জে ভাঙা ইংরেজিতে বক্তব্য দেন। একপর্যায়ে কেয়া তাকে চীনা ভাষায় কথা বলার পরামর্শ দিলে উপস্থিতদের মধ্যে আরও কৌতূহল ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

সংবাদকর্মীদের সামনে দম্পতি দাবি করেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তারা বৈধভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। তবে তাদের দেখানো হলফনামা, নিকাহনামা ও ম্যারেজ সংক্রান্ত নথিতে থাকা তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নথিতে নোটারি পাবলিক ও মেহেরপুর জজ আদালতের আইনজীবী রূতসোভা মণ্ডলের নাম, সিলমোহর ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, গত তিন বছরে কোনো বিদেশি নাগরিকের বিয়ের হলফনামা বা সংশ্লিষ্ট নথি তিনি সম্পাদন করেননি। তার নাম ও সিল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ফলে নথিপত্রের সত্যতা নিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি উঠেছে।

এদিকে মেহেরপুর সদর উপজেলার নিকাহ রেজিস্টার নান্নু জানান, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকের বিয়ে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই দম্পতি চীনা দূতাবাসের কোনো বৈধ এনওসি দেখাতে পারেননি। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং ডং জে বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণের পর মোহাম্মদ আলী নাম গ্রহণ করেন। দেনমোহর চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলেও নথির বৈধতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। চীনা যুবক-এর দেওয়া তথ্য ও সরকারি নথির মধ্যে মিল রয়েছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে।

বাংলাদেশ তথ্য ও মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল আলম বলেন, বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, অভিবাসন বিধি এবং বিবাহ নিবন্ধনের সব আইনি শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি কোনো নথি জালিয়াতি, তথ্য গোপন বা প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়। অন্যদিকে মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পার্সন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তের দিকেই এখন সবার নজর।

আরোও পড়ুন – দূরন্ত পলাশ এডমিন মাসউদুল গ্রেপ্তার, প্রতারণা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি আটক

প্রেমের টানে চীনা যুবক মেহেরপুরে, বিয়ের কাগজে রহস্য ও আইনি প্রশ্ন

জুলাই ১৭, ২০২৬

এস কে সামিউল ইসলাম, মেহেরপুর প্রতিনিধিঃ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, সেখান থেকে প্রেম, এরপর হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের চীন থেকে বাংলাদেশে আগমন। এমনই আলোচিত ঘটনাকে ঘিরে এখন মেহেরপুরজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। চীনা যুবক ডং জে, যিনি বর্তমানে নিজের নাম মোহাম্মদ আলী বলে পরিচয় দিচ্ছেন, দাবি করেছেন তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মেহেরপুর পৌর এলাকার ঘোষপাড়ার বাসিন্দা শরিফ ড্রাইভারের মেয়ে কেয়া খাতুনকে বৈধভাবে বিয়ে করেছেন। তবে তাদের উপস্থাপিত নথিপত্র, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া যাওয়ায় পুরো ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসন, আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল এবং প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেয়া খাতুনের সঙ্গে ডং জে-এর পরিচয় হয়। দীর্ঘদিন অনলাইনে যোগাযোগের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কেয়া জানান, প্রেমের টানে ডং জে প্রথমবার মেহেরপুরে এসে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে তার সঙ্গে দেখা করেন। পরে তিনি প্রায় ১৭ দিন শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন। এরপর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তারা বিয়ে করেন বলে দাবি করেন। বিয়ের পর দুজন চীনে চলে যান এবং সেখানে প্রায় তিন মাস অবস্থান শেষে সম্প্রতি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তবে চীনা যুবক-এর বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার রাতে কেয়া তার বাবার বাড়িতে ওই বিদেশি নাগরিককে নিয়ে গোপনে আসেন। বিষয়টি জানাজানি হলে আশপাশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয় এবং এলাকায় ভিড় জমে। পরদিন সকালেই তারা সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান। এ সময় সংবাদকর্মী, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কেয়ার বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, তারা মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিসপাড়ার একটি পাঁচতলা ভবনের ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন। সেখানে গিয়ে সংবাদকর্মীরা তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চীনা যুবক ডং জে ভাঙা ইংরেজিতে বক্তব্য দেন। একপর্যায়ে কেয়া তাকে চীনা ভাষায় কথা বলার পরামর্শ দিলে উপস্থিতদের মধ্যে আরও কৌতূহল ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

সংবাদকর্মীদের সামনে দম্পতি দাবি করেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তারা বৈধভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। তবে তাদের দেখানো হলফনামা, নিকাহনামা ও ম্যারেজ সংক্রান্ত নথিতে থাকা তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নথিতে নোটারি পাবলিক ও মেহেরপুর জজ আদালতের আইনজীবী রূতসোভা মণ্ডলের নাম, সিলমোহর ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, গত তিন বছরে কোনো বিদেশি নাগরিকের বিয়ের হলফনামা বা সংশ্লিষ্ট নথি তিনি সম্পাদন করেননি। তার নাম ও সিল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ফলে নথিপত্রের সত্যতা নিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি উঠেছে।

এদিকে মেহেরপুর সদর উপজেলার নিকাহ রেজিস্টার নান্নু জানান, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকের বিয়ে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই দম্পতি চীনা দূতাবাসের কোনো বৈধ এনওসি দেখাতে পারেননি। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং ডং জে বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণের পর মোহাম্মদ আলী নাম গ্রহণ করেন। দেনমোহর চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলেও নথির বৈধতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। চীনা যুবক-এর দেওয়া তথ্য ও সরকারি নথির মধ্যে মিল রয়েছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে।

বাংলাদেশ তথ্য ও মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল আলম বলেন, বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, অভিবাসন বিধি এবং বিবাহ নিবন্ধনের সব আইনি শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি কোনো নথি জালিয়াতি, তথ্য গোপন বা প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়। অন্যদিকে মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পার্সন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্তের দিকেই এখন সবার নজর।

আরোও পড়ুন – দূরন্ত পলাশ এডমিন মাসউদুল গ্রেপ্তার, প্রতারণা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি আটক