অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস: অজানা ব্যথায় নীরব বাংলাদেশ (প্রথম পর্ব)

বিশেষ প্রতিবেদনঃ
বাংলাদেশে নীরবে বাড়ছে এক ভয়াবহ কিন্তু কম পরিচিত রোগ— অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস (Ankylosing Spondylitis)। এটি এমন এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিস, যা মূলত মেরুদণ্ড ও জয়েন্টে আক্রমণ করে ধীরে ধীরে হাড় শক্ত করে ফেলে, ফলে রোগী ধীরে ধীরে নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারায়।

এই রোগে আক্রান্ত অনেকেই প্রথমে বুঝতেই পারেন না যে এটি একটি জটিল স্নায়বিক-অস্থি-সংক্রান্ত রোগ। ফলে তারা বছরের পর বছর ব্যথানাশক খেয়ে চলেন, যা অস্থায়ী উপশম দিলেও রোগের মূল উৎসকে নিরাময় করতে পারে না।


🔹 নিম্নবিত্ত রোগীদের দুঃসহ বাস্তবতা

অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসের চিকিৎসা ব্যয় বাংলাদেশে এক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য প্রায় অসহনীয় পর্যায়ের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের জন্য যেসব বায়োলজিক ইনজেকশন (যেমনঃ Adalimumab, Etanercept, Infliximab) ওষুধ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর দাম প্রতি ডোজ ৩০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত।

অনেক সময় রোগীকে প্রতি মাসে বা দুই মাসে একবার এই ইনজেকশন নিতে হয়।
এর সাথে ফিজিওথেরাপি, ডায়াগনস্টিক টেস্ট, এবং নিয়মিত ওষুধের খরচ মিলিয়ে মাসে ১ লক্ষ টাকার বেশি ব্যয় হয়ে যায়।

বাংলাদেশের নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ফলে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়, যা পরিণতিতে তাদের স্থায়ী পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়।


🔹 সরকারি সহায়তার অভাব

দেশে এখনো অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস-এর জন্য কোনও বিশেষ সরকারি চিকিৎসা স্কিম বা ভর্তুকি কার্যক্রম নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে আর্থ্রাইটিস বা স্পাইনাল ডিজিজের জন্য আলাদা ডেটাবেইজও নেই, যার ফলে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে, ভারত, নেপাল, এমনকি শ্রীলঙ্কা পর্যন্তও ইতিমধ্যে রিউমাটয়েড ও অটোইমিউন রোগীদের জন্য সরকারি সহায়তা প্রকল্প চালু করেছে। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু বায়োলজিক ওষুধ সরকার ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ করছে।

বাংলাদেশে যদি সরকার বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়, তবে হাজারো নিম্নবিত্ত রোগী নতুন জীবন পেতে পারে।


🔹 চিকিৎসকদের দৃষ্টিভঙ্গি

ঢাকার রিউমাটোলজিস্ট ডা. মাহমুদা ফেরদৌস জানান,

“অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, নিদ্রাহীনতা ও মানসিক অবসাদ তৈরি করে। রোগটি যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে সচেতনতা ও চিকিৎসা সুবিধার অভাবে রোগীরা শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসা নিতে আসেন।”

তিনি আরও বলেন,

“সরকার যদি ‘রেয়ার ডিজিজ সাপোর্ট স্কিম’ বা ‘অটোইমিউন ভর্তুকি প্রোগ্রাম’ চালু করে, তাহলে অসংখ্য যুবক-যুবতী কর্মক্ষম অবস্থায় ফিরে আসবে।”


🔹 জনগণের আবেদন: জীবন বাঁচানোর আহ্বান

অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসে আক্রান্তরা এখন সরকারের প্রতি একটাই আবেদন রাখছেন —

“আমাদের ওষুধ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। অন্তত ভর্তুকি দিয়ে চিকিৎসা ও ইনজেকশনটি সহজলভ্য করুন।”


📊 বিশেষ তথ্য (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ রিউমাটোলজি সোসাইটি)

দেশে প্রায় ১ লাখের বেশি মানুষ অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসে আক্রান্ত।

আক্রান্তদের প্রায় ৭০% পুরুষ, বয়স ২০–৪০ বছরের মধ্যে।

৮০% রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারে না উচ্চ খরচের কারণে।

অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস: অজানা ব্যথায় নীরব বাংলাদেশ (প্রথম পর্ব)

অক্টোবর ৭, ২০২৫

বিশেষ প্রতিবেদনঃ
বাংলাদেশে নীরবে বাড়ছে এক ভয়াবহ কিন্তু কম পরিচিত রোগ— অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস (Ankylosing Spondylitis)। এটি এমন এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিস, যা মূলত মেরুদণ্ড ও জয়েন্টে আক্রমণ করে ধীরে ধীরে হাড় শক্ত করে ফেলে, ফলে রোগী ধীরে ধীরে নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারায়।

এই রোগে আক্রান্ত অনেকেই প্রথমে বুঝতেই পারেন না যে এটি একটি জটিল স্নায়বিক-অস্থি-সংক্রান্ত রোগ। ফলে তারা বছরের পর বছর ব্যথানাশক খেয়ে চলেন, যা অস্থায়ী উপশম দিলেও রোগের মূল উৎসকে নিরাময় করতে পারে না।


🔹 নিম্নবিত্ত রোগীদের দুঃসহ বাস্তবতা

অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসের চিকিৎসা ব্যয় বাংলাদেশে এক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য প্রায় অসহনীয় পর্যায়ের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগের জন্য যেসব বায়োলজিক ইনজেকশন (যেমনঃ Adalimumab, Etanercept, Infliximab) ওষুধ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর দাম প্রতি ডোজ ৩০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত।

অনেক সময় রোগীকে প্রতি মাসে বা দুই মাসে একবার এই ইনজেকশন নিতে হয়।
এর সাথে ফিজিওথেরাপি, ডায়াগনস্টিক টেস্ট, এবং নিয়মিত ওষুধের খরচ মিলিয়ে মাসে ১ লক্ষ টাকার বেশি ব্যয় হয়ে যায়।

বাংলাদেশের নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ফলে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়, যা পরিণতিতে তাদের স্থায়ী পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়।


🔹 সরকারি সহায়তার অভাব

দেশে এখনো অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস-এর জন্য কোনও বিশেষ সরকারি চিকিৎসা স্কিম বা ভর্তুকি কার্যক্রম নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে আর্থ্রাইটিস বা স্পাইনাল ডিজিজের জন্য আলাদা ডেটাবেইজও নেই, যার ফলে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে, ভারত, নেপাল, এমনকি শ্রীলঙ্কা পর্যন্তও ইতিমধ্যে রিউমাটয়েড ও অটোইমিউন রোগীদের জন্য সরকারি সহায়তা প্রকল্প চালু করেছে। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু বায়োলজিক ওষুধ সরকার ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ করছে।

বাংলাদেশে যদি সরকার বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়, তবে হাজারো নিম্নবিত্ত রোগী নতুন জীবন পেতে পারে।


🔹 চিকিৎসকদের দৃষ্টিভঙ্গি

ঢাকার রিউমাটোলজিস্ট ডা. মাহমুদা ফেরদৌস জানান,

“অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, নিদ্রাহীনতা ও মানসিক অবসাদ তৈরি করে। রোগটি যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে সচেতনতা ও চিকিৎসা সুবিধার অভাবে রোগীরা শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসা নিতে আসেন।”

তিনি আরও বলেন,

“সরকার যদি ‘রেয়ার ডিজিজ সাপোর্ট স্কিম’ বা ‘অটোইমিউন ভর্তুকি প্রোগ্রাম’ চালু করে, তাহলে অসংখ্য যুবক-যুবতী কর্মক্ষম অবস্থায় ফিরে আসবে।”


🔹 জনগণের আবেদন: জীবন বাঁচানোর আহ্বান

অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসে আক্রান্তরা এখন সরকারের প্রতি একটাই আবেদন রাখছেন —

“আমাদের ওষুধ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। অন্তত ভর্তুকি দিয়ে চিকিৎসা ও ইনজেকশনটি সহজলভ্য করুন।”


📊 বিশেষ তথ্য (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ রিউমাটোলজি সোসাইটি)

দেশে প্রায় ১ লাখের বেশি মানুষ অ্যাংকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসে আক্রান্ত।

আক্রান্তদের প্রায় ৭০% পুরুষ, বয়স ২০–৪০ বছরের মধ্যে।

৮০% রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারে না উচ্চ খরচের কারণে।