স্ত্রীর অনুমতি নয়, আরবিট্রেশন কাউন্সিলই মুখ্য: দ্বিতীয় বিয়েতে হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

নিউজ ডেস্কঃ

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত বিষয় হিসেবে আলোচিত। সামাজিক বাস্তবতা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও আইনি কাঠামোর মধ্যে দ্বন্দ্বের জায়গা থেকে বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাইকোর্টের একটি রায় এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে অনুমতির প্রশ্নে প্রচলিত ধারণাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে।


মুসলিম পারিবারিক আইন সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন যে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ধরনের বিয়ের অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার আইন অনুযায়ী আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত। ফলে স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্বিতীয় বিয়ে করা সম্ভব—এমন ব্যাখ্যাই উঠে এসেছে রায়ে।


দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আদালত তার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করেন, মুসলিম পারিবারিক আইনে সরাসরি এমন কোনো বাধ্যবাধকতার সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। বরং আইনটি দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্থানীয় আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর অর্পণ করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ভুলভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।


২৪ পাতার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি এবং ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারাগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও পরবর্তীতে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি পৃথক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়। সে অনুযায়ী, আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে এক বছর কারাদণ্ড বা আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।


এই রায়ের বিরুদ্ধে রিটকারীরা আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, আদালতের এই ব্যাখ্যার ফলে বহুবিবাহ সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তারা মনে করছেন, নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ও পারিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে উদ্দেশ্যে রিট করা হয়েছিল, এই রায়ে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।


সমাজবিজ্ঞানী ও পারিবারিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সামর্থ্য বা ব্যক্তিগত প্রলোভনের কারণে একাধিক বিয়ের সুযোগ অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যায়। এর ফলে পারিবারিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি এবং মানসিক অস্থিরতার মতো সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই বিষয়টি কেবল আইনগত নয়, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।


আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আপিল বিভাগে বিষয়টি গড়ালে দ্বিতীয় বিয়ে সংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যা আরও সুস্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে এই রায়কে কেন্দ্র করে আগামী দিনে আইনি ও সামাজিক পরিসরে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্ত্রীর অনুমতি নয়, আরবিট্রেশন কাউন্সিলই মুখ্য: দ্বিতীয় বিয়েতে হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

জানুয়ারি ১১, ২০২৬

নিউজ ডেস্কঃ

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত বিষয় হিসেবে আলোচিত। সামাজিক বাস্তবতা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও আইনি কাঠামোর মধ্যে দ্বন্দ্বের জায়গা থেকে বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাইকোর্টের একটি রায় এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে অনুমতির প্রশ্নে প্রচলিত ধারণাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে।


মুসলিম পারিবারিক আইন সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন যে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ধরনের বিয়ের অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার আইন অনুযায়ী আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত। ফলে স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্বিতীয় বিয়ে করা সম্ভব—এমন ব্যাখ্যাই উঠে এসেছে রায়ে।


দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আদালত তার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করেন, মুসলিম পারিবারিক আইনে সরাসরি এমন কোনো বাধ্যবাধকতার সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। বরং আইনটি দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্থানীয় আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর অর্পণ করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ভুলভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।


২৪ পাতার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি এবং ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারাগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও পরবর্তীতে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি পৃথক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়। সে অনুযায়ী, আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে এক বছর কারাদণ্ড বা আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।


এই রায়ের বিরুদ্ধে রিটকারীরা আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, আদালতের এই ব্যাখ্যার ফলে বহুবিবাহ সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তারা মনে করছেন, নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ও পারিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে উদ্দেশ্যে রিট করা হয়েছিল, এই রায়ে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।


সমাজবিজ্ঞানী ও পারিবারিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সামর্থ্য বা ব্যক্তিগত প্রলোভনের কারণে একাধিক বিয়ের সুযোগ অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যায়। এর ফলে পারিবারিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি এবং মানসিক অস্থিরতার মতো সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই বিষয়টি কেবল আইনগত নয়, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।


আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আপিল বিভাগে বিষয়টি গড়ালে দ্বিতীয় বিয়ে সংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যা আরও সুস্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে এই রায়কে কেন্দ্র করে আগামী দিনে আইনি ও সামাজিক পরিসরে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।